বর্তমান বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে এ ভাইরাসে এক হাজারের বেশী মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা গেছেন। এখন ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট,শহর বন্দর, গ্রামগঞ্জে সর্বত্র উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা বিরাজ করছে। ইতিমেধ্য এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে সরকার। শুধু তাই নয়, প্রায় অর্ধমাসের বেশী সময় ধরে সারাদেশে ‘লকডাউন’ চলছে। সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী লকডাউনের মেয়াদ আরো বাড়বে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র মানুষ। বিশেষ করে দিনমজুররা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তারা এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। মুলত ঘরবন্দি হয়ে পড়ার কারণে খাদ্যসংকটে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কেননা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে নিরাপদে থাকতে দেশের অধিকাংশ মানুষ বাসায় অবস্থান করছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ওষুধের দোকান, কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান ছাড়া মূলত অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা নেই। গণপরিবহণও বন্ধ রয়েছে । এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ। এখন কাজ বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তারা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাসও এসেছে। করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রতিঘাত মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ প্রণোদনা ব্যবস্থা ও দরিদ্র মানুষের সাহায্যের ব্যাপারে সরকার মনোযোগী হতে হবে। মানুষ এখন বেঁচে থাকার জন্য করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এসময় তারা যদি খাবার না পায় তা হলে এর চেয়ে দুঃখ ও হতাশাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে। সুতরাং সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেকোনো ধরনের অবহেলা অনেক বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতার মধ্য দিয়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জারি রাখতে হবে।
ইতোমধ্যে সরকার নিম্ন আয়ের ও দুস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা দিতে শুরু করেছে। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া এ রকম দরিদ্র দিনমজুরদের বাড়ি বাড়ি চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এমন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। তবে এই চরম সংকটের সময়ও গরিব, অসহায় ও দিনমুজুরী মানুষের ত্রাণ চুরি করছে কিছু অসত্ ব্যক্তি। এসব মানুষের কোনো ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ নেই। এদের বিরুদ্ধে সরকার প্রধানকে আরো সতর্ক হতে হবে এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা জানি, স্বল্প আয়ের মানুষের কোনো সঞ্চয় নেই। কাজ বন্ধ থাকার ফলে তাদরে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বিশেষ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে দেশব্যাপী খাদ্যসংকটে পড়া মানুষের কাছে শিগগির খাদ্য পৌঁছাতে না পারলে তাদের ঘরে রাখা সম্ভব হবে না। খাদ্য জোগাড়ের প্রয়োজনে তারা বাইরে বের হতে বাধ্য হবে। ইতিমধ্যে শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামে ফিরে গেছে। তাদের কাছে জরুরি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে ধনী ও বিত্তবানদের উচিত ব্যক্তিগত বা সামষ্টিগতভাবে দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। প্রতিটা ধর্মে সবার প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। যার অন্তরে দয়ামায়া আছে, যে পরোপকারী, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, রুগ্ন ব্যক্তির সেবা করো এবং বন্দীকে মুক্ত করো অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করো।’ বর্তমানর পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালীদের সাহায্য ও সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করতে হবে। কারণ নিঃস্বার্থভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য ও সেবা করাই মানবধর্ম।
কেননা প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষেরই পারস্পরিক মানবতাবোধ ও উদারনৈতিক মনমানসিকতা থাকা অপরিহার্য। একজন মানুষ বিপদে পড়লে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসহায় হলে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা সমাজের বিত্তবান প্রতিবেশীদের ইমানি দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্য। মানবপ্রেমিক কবি চ্লিদাসের ভাষায়- ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ এখন সব মানুষের উচিত সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দয়ামায়া, অকৃত্রিম ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, সম্প্রতি ও সহানুভূতি বজায় রাখা। তাই দেশের সর্বস্তরের ধনাঢ্য, বিত্তবান, শিল্পপতি ব্যবসায়ীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান দেশের এই পরিস্থিতিতে গরিব, অসহায় ও দিনমুজুরী মানুষকে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করুন।
লেখক: তাহিন আক্তার, শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।