শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে করণীয়

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল প্রকার অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল প্রকার অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সাধারণ ছুটির মধ্যেও অফিস/প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থেই খোলা রাখতে হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জরুরি সেবা দপ্তর (পানি, বিদ্যুৎ), ব্যাংক, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক সরাসরি করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসার কারণে করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। তবে লক্ষ করা গেছে যে অনেক ব্যাংকে কর্মরত ও বিভিন্ন অফিসে কর্মরতরাও খুব বেশি জনসম্পৃক্ত না থেকেও করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ওই সব কর্মস্থলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বিগত দশক থেকে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরামদায়ক কর্মপরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি এবং প্রায় সব ব্যাংক বা অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত প্রায় সব এসি রুমের ভেতরের বাতাসকে ঠান্ডা করে তা পুনঃপ্রবাহের মাধ্যমে সরবরাহ করে। এসি রুমের ভেতরের বাতাস বাইরে বের হতে দেয় না বিধায় এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। কিছু ক্ষেত্রে দামি এসিতে বাতাসকে ধুলাবালিমুক্ত করতে ডাস্ট ফিল্টার ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যা ধূলিকণা এমনকি ব্যাকটেরিয়া পর্যন্ত পরিশোধন করতে পারে। বিশেষ বিশেষ স্থান (ওষুধ শিল্প, ফুড প্রসেসিং, উচ্চ সংক্রমণ হয় এমন চিকিৎসা কক্ষ/ অপারেশন থিয়েটারের কিছু কিছু এসিতে এইচইপিএ (হাই-এফিসিয়েন্সি পার্টিকুলার এয়ার) আল্ট্রা ফিল্টার ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশের প্রচলিত কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসিতে এ ধরনের এইচইপিএ ফিল্টার ব্যবহার করা হয় না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের তাপমাত্রা সাধারণত ২০-২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে রাখা হয়, যা করোনাভাইরাস বিস্তারের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা। করোনা সংক্রমণ বর্তমানে কমিউনিটি লেভেল কন্টামিনেশন স্তরে। এ অবস্থায় কে নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) বাহক বা আক্রান্ত তা সহজে ও লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যদি একজন করোনাভাইরাস বাহক বা আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে অবস্থান করেন, তার শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাস ওই স্থানে ছড়ানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু শীতাতপ যন্ত্র একই বাতাস ঠান্ডা করে পুনরায় প্রবাহ করে, তার মানে যেকোনো করোনাভাইরাস বাহক ব্যক্তি থেকে ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে যারা থাকবেন তাদের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব এক বা দুই মিটার বা এর অধিক হলেও এই দূরত্বে অবস্থান মুখ্য বিষয় নয়, সমগ্র বাতাস দূষিত বা কন্টামিনেটেড অবস্থায় থাকতে পারে। আর সম্ভবত এ কারণেই প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যাংক, সুপারশপসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কর্মস্থলের অনেকেই করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রায় দীর্ঘ দুই মাস পর সরকার সাধারণ ছুটি স্থগিত করেছে এবং সীমিত আকারে সব অফিস ও ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে করোনা সংক্রমণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরকার এ বিষয়টি নিয়ে হয়তো অন্যান্য পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। তবে করোনা মহামারী দীর্ঘস্থায়ী হলে দীর্ঘদিন সব অফিস ও বাণিজ্যিক কাজ বন্ধ রাখা যাবে না এবং সম্প্রতি অফিস-আদালত খোলার পরিপ্রেক্ষিতে কর্মস্থলকে করোনা সংক্রমণ হ্রাসের ক্ষেত্রে কতিপয় সতর্কতা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কিছু পদক্ষেপ কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই শুধু সচেতনতা ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে কর্মস্থলের করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি হ্রাস করা যায়।

 পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকটি প্রথমেই বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘদিন অফিস ছুটি থাকার কারণে ধুলা ময়লা পরিষ্কার করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে অফিসে সব আসবাব, পর্দা, মেঝে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

 অফিসের মেঝেতে কার্পেট থাকলে তা সরিয়ে ফেলা, সরানো সম্ভব না হলে তার ওপর প্লাস্টিক বা রেক্সিনের ম্যাট দেয়া। কেননা কার্পেটের ওপর করোনাভাইরাস থাকলে তা সহজে পরিষ্কার করা যায় না।

 এখন বৃষ্টির কারণে বাইরে বাতাসে ধুলাবালি কম থাকায় অফিসের জানালা খুলে বাইরের পরিষ্কার বাতাস ও সূর্যের আলো ঢুকতে দেয়া। বেশি পরিমাণ বাতাস ও সূর্যের আলো করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে।

 কর্মস্থলে কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে সেখানে একটু বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রতিদিন অফিস চালু করার আগে ও পরে অন্তত আধা ঘণ্টা সব জানালা ও দরজা খোলা রেখে শীতাতপ যন্ত্র শুধু ফ্যান মোডে চালু রাখতে হবে। এতে করে ভেতরের সারা দিনের দূষিত বাতাস বাইরে বের করে নতুন নির্মল বাতাস ভেতরে ঢুকবে।

 শীতাতপ যন্ত্রকে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করতে হবে। তবে লক্ষ রাখতে হবে যেকোনো প্রকার দাহ্য কেমিক্যাল/জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে না।

 অফিসের অভ্যন্তরে এসির তাপমাত্রা যত সম্ভব বেশি রাখা। ২৫ ডিগ্রি বা তার ওপর রাখতে পারলে ভালো। তাপমাত্রা বেশি রাখলে এসির ফ্যানের গতি বাড়িয়ে রাখলে আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে।

ওপরের পদক্ষেপগুলোর পাশাপশি কিছু পদ্ধতিগত পরিবর্তন বা সংযোজন করে কর্মপরিবেশকে অধিক জীবাণুমুক্ত করা যায়

 শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ইনডোর ইউনিটের ডাস্ট ফিল্টারের ওপর অতিরিক্ত ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে।

 আমাদের দেশে প্রচলিত অধিকাংশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সঙ্গে বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহ ব্যবস্থা থাকে না বিধায় আলাদাভাবে বিশুদ্ধ বাতাসের ব্যবস্থা স্থাপন করা।

 বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পোর্টেবল এয়ার পিউরিফায়ার পাওয়া যায়। সেগুলো ব্যবহার করে অফিসের অভ্যন্তরের বাতাস জীবাণুমুক্ত রাখা যায়।

 শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির সরবরাহ ব্যবস্থা ডাক্ট সিস্টেমের হলে বাতাস সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ইউভি (আল্ট্রাভায়োলেট রে) বাতাস বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করে পুরো সরবরাহকৃত বাতাস জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে।

 অফিস-আদালত এমনকি স্কুল-কলেজের নিয়মিত ব্যবহারের রুম বাদেও করোনা সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দুটি জায়গার মধ্যে লিফট ও টয়লেট অন্যতম। এ দুটি জায়গাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

 টয়লেট নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কারের পাশাপাশি উন্নতমানের ফিল্টারসহ এগজস্ট সিস্টেম না থাকলে তা বসানো, বাতাস প্রবাহের জন্য টয়লেটের অভ্যন্তরে প্রয়োজনে ফ্যানের ব্যবস্থা করা।

 টয়লেটের পানির কল অটোমেটিক বা সেন্সরযুক্ত হলে তা পানি সাশ্রয় করবে। অটোমেটিক সোপ ডিসপোজাল ও হ্যান্ড ড্রায়ার বসানো যেতে পারে।

 অফিসে যদি লিফট থাকে সেটিতে নানান মানুষ ব্যবহার করবে বিধায় লিফটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। লিফটে যত কম মানুষ একসঙ্গে একবারে ওঠানো যায় তা নিশ্চিত করা এবং সবাই লিফটের দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো।

 লিফটের বাটন কিছুক্ষণ পর পর স্যানিটাইজার দিয়ে মোছা এবং লিফট ব্যবহারকারী লিফট থেকে বেরিয়ে হাত স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা।

 লিফটে কিছু প্রযুক্তির সংযোজন করে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবাণুমুক্ত বা করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা যেতে পারে।

করোনাভাইরাস অদৃশ্য ও শক্তিশালী, সারা বিশ্বের সব দেশই মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধক অথবা প্রতিষেধক টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে এ পর্যন্ত সব তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে করোনাভাইরাস শুধু সচেতনতার কাছে পরাস্ত। তাই নিরাপদে থাকতে অবশ্যই নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সাবধান থাকার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক: স্থপতি ও গবেষক; হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কর্মরত

 

আরও