"লেস দেন ওয়ান" রচনাবলীতে জোসেফ ব্রডস্কি বলেছিলেন কবির জীবন কথাটা যে অভিঘাত সৃষ্টি করে "কবির মৃত্যু "তার চাইতে বরং বেশী করে।ব্রডস্কির চিন্তানুসরন করে বলতে পারি আমজনতার জীবন ধর্তব্যের কোন বিষয় না, মৃত্যু হয়তো কিছুটা। কারণ জনতাপিন্ডের জীবন অস্পষ্ট উনুজ্জল অনুল্লেখ্য তাই তাদের স্বাস্থ্যও বিষয় হিসেবে আমলযোগ্য নয় ।চলতি ভাষায় বলা হয় "ওরা" কোন ভ্যালূ এ্যাড করার ক্ষমতা রাখে না ।অসংখ্য মৃত্যু ইউরোপ আমেরিকার জীবিতদেরও মারণভয়ে অস্থির করে ফেলেছে।সংক্রমণে যারা মারা গেল তারা তো গেলই।যারা বেঁচে আছে প্রিয়জন হারিয়ে, সংক্রমণে শঙ্কা নিয়ে, লকডাউন উঠে গেলে অর্থনৈতিক অচলাবস্থার অভিঘাতে কাজ হারানোর ভয়ে কত মানুষ যে স্থায়ী মনো বৈকল্যের শিকার হবে,ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়। জনস্বাস্থ্য আর অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য দুটোই ভয়াবহভাবে ভঙ্গুর দশায় নিপতিত।
উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম সূচক নাগরিকের সুস্বাস্থ্য।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মতে দেশের জিডিপি-র কমপক্ষে ৫% অথবা বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহার করতে হবে।ধনী দেশগুলিতে জিডিপি-র ৫%-এর বেশিই স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হলেও আমাদের মতো দেশে ব্যত্যয় ঘটেই । যদিও ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে মোট বরাদ্দের ৫.০৩ % রাখা হয়েছিল স্বাস্থ্যখাতের জন্য, যা ২৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাধারণ জনগনের সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা যেমন দারিদ্র অন্য আরেকটি বাধা সচেতনতার অভাব।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সমান নয়, দেশটা যতই গনতান্ত্রিক হোক। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া স্বাস্থ্যনীতি বারাক ওবামার অন্যতম অবদান। "ওবামাকেয়ার" নামের স্বাস্থ্যনীতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ গ্রহণের পর প্রথম কাজ হিসেবে তাতে পরিবর্তন এনেছেন।ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় থেকেই বলে আসছিলেন যে তিনি ওবামাকেয়ার বাতিল করবেন। ধনতন্ত্রের মানস শাবক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে, তাঁর প্রশাসন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি বরাদ্দ কাটছাঁট করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেসরকারিকরণ নিশ্চিত করেছে। এই রোগের প্রাদুর্ভাবে তারই মাসুল দিতে হচ্ছে মার্কিন নাগরিকদের, যে সকল নাগরিকদের স্বাস্থ্যবীমা নাই ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আমেরিকান কংগ্রেসে কোভিড-১৯ প্রণোদনা বিল পাস করেছে। এই প্রণোদনা তহবিল থেকে মেডিকেইডের মাধ্যমে বিমাহীন নাগরিকদের জন্য বিনা মূল্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। মহামারীতে স্বাস্থ্যবিমাহীন বেশি সংখ্যক আমেরিকান দের সরকারি চিকিত্সা সেবার আওতায় আনার লক্ষ্যে এই আইন ।" স্বাস্থ্যবিমা নেই বলে কোভিড-১৯ লক্ষণ নিয়ে বাসায় বসে না থেকে হাসপাতাল আসতে দ্বিধাবোধ করবেন না।" আমেরিকান প্রশাসনের এই ব্রাকেটবদ্ধ বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার স্বাস্থ্যবিমাহীন আমেরিকানরা খরচের ভয়ে সরকারী স্বাস্থ্যসেবা নিতে কি পরিমান নেতিবাচক ধারণা পোষন করেন।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিশ্বের দু’নম্বরে থাকা ইটালিও প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক সময়ে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দেয়নি তাই পরে সমস্যা সামলাতে পারেনি।ইটালিয়ান দার্শনিক গিয়ার্গো অ্যাগাম্বেনের ভাবনাটি খুব প্রাসঙ্গিক, ' সমাজ একটা নগ্ন জীবনে প্রবেশ করছে। ইটালিয়ানদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু উত্সর্গ করা জরুরী হয়ে পড়েছে সাধারণের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস সব বদলে গেছে-রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়েই এটা করেছে।উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া জীবন এবং প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।’
Desert Fox উপাধিতে ভূষিত হিটলারের প্রিয় জেনারেল ফিল্ড মার্শাল রোমেল এর যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি উক্তি "সবাই চোখ -কান খোলা রাখে।আমি নাকও খোলা রাখি।গন্ধ শুঁকি।বিপদের গন্ধ শোঁকা যায়" বিপদের গন্ধ দূর্যোগের আভাস শুধু নিন্ম শ্রেণীর প্রাণীরাই নয় বিদগ্ধরাও পান যেমন বিল গেটস ২০১৫ সালেই সতর্ক করেছিলেন এমন একটি সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পন্ন ভাইরাসের কবলে যে দুনিয়া পড়তে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগনও স্বাস্থ্যখাতে সরকারী বরাদ্দ বাড়াতে পরামর্শ দিলেও কান দেননি নীতি নির্ধারকরা।তবে কিছু কিছু দেশ সময় মতো ব্যবস্থা নেয়ায় মহামারীর তীব্রতা কমানো গেছে আর কিউবার মতো কিছু দেশ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচেই বদলে ফেলে সাফল্য পেয়েছে এবং তা করোনা প্রাদুর্ভাবের অনেক আগেই।
কিউবার সিনিয়র একজন চিকিত্সক ড. কুইভ্যাস হিল বিবিসি'র সাথে আলাপে রসিকতা করে বলেন, ‘আমার নার্স জানে তারা কোথায় থাকে। তারা দৌড়াতে পারবে, কিন্তু পালাতে পারবে না’।বার্ষিক দুটি পরীক্ষণের কোনটি যদি নাগরিকরা এড়াতে চায় তাহলে কিভাবে তা নিশ্চিত করা হয় তার উত্তরে ড. কুইভ্যাস হিলউপর এই কৌতুকপ্রদ কথা বলেন।
বাস্থ্যখাতে নাগরিকপ্রতি মাত্র ৪৩১ মার্কিন ডলার খরচ করে কিউবার শিশুমৃত্যুর হার মাথাপ্রতি সাড়ে আট হাজার ডলারের বেশী খরচ করা যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে কম আর গড় আয়ু যুক্তরাষ্ট্রের সমান। কিউবার স্বাস্থ্যসেবা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোই কেবল নয় অনেক ধনী দেশের স্বাস্থ্যসেবাকেও হার মানিয়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, অন্য দেশগুলো কিউবার কাছ থেকে শিখতে পারে।
বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সন্নিবেশ করে নির্ধারণ করা হয় নাগরিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি যা আদতে রোগ আসার আগেই আগাম প্রতিরোধমুলক ব্যবস্থা।।রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তুলে মোকাবেলা করাই জনস্বাস্থ্যের মূলনীতি। এই মূলনীতি মেনে কিউবান মডেলে কাজ করে যে কারণে সার বিশ্ব যখন করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে তখন কিউবার করোনা পরিস্থিতি যথেষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে।
ভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। স্তর-১-এ অর্থ একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়া দেশ । বিদেশফেরত কোন ব্যক্তি সনাক্ত হওয়া ও তাঁদের মাধ্যমে আরো সংক্রমণ, স্তর-২। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সংক্রমণ সীমিত থাকলে তা স্তর-৩। আর স্তর-৪ এর মানে সংক্রমণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া।এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে কী পরিমাণ জনসংখ্যা সংক্রমিত হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই।যেহেতু সব সংক্রমণের শিকার ব্যাক্তির লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
এখন পর্যন্ত যে পরিসংখ্যান তাতে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে মোট সংক্রমণের অর্ধেকের বেশি ঘটেছে সম্পদশালী ইউরোপে।যদিও নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে সংক্রমণের তীব্রতা কম। এও সত্য এ ধরনের ভাইরাস মোকাবেলায় সামর্থ্য সব দেশের সমান নয়।বাংলাদেশও সক্ষমতা বিবেচনায় ভালো অবস্থানে নেই।ভাইরাস মোকাবেলায় চিরাচরিত গা ছাড়া ভাব প্রথম থেকেই বিধিলিপির মতো লেগে ছিল। প্রস্তুতিতে দ্বিধা ছিল, ছিল সমন্বয়হীনতার প্রাবল্য।চলতি দূর্যোগ মোকাবেলেয় স্তাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রধান করে যে কমিটি করা হয়েছে এতেও নাই যথাযথ সমন্বয়।লাখ লাখ গার্মেন্টস কর্মীকে ঢাকায় এনে আবার ফেরত পাঠানোর হলো।বানিজ্য মন্ত্রনালয় জনস্তাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেয়ায় এ আবিমৃশ্যকারিতা।এর আগে সরকার প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ১০ দিনের ছুটি দেয় কিন্তু ঘোষণার সময় যোগাযোগ চালু ছিল।সে সময় ঢাকা ছাড়ে কয়েক লাখ মানুষ। সামাজিক দূরত্ব তৈরীর প্রথম পদক্ষেপ চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
দেশ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চূড়ান্ততায় পৌঁছেছে তাতে এটা এখন আর শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা দিয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের মাধ্যমে মহামারী মোকাবেলা সংক্রান্ত একটি জাতীয় কর্মকৌশল প্রস্তুত করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই উদ্যোগে দল নির্বিশেষে প্রয়োজনে সব বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হবে।
প্রস্তুতি সমন্বয় প্রায় সবকিছুই দৃষ্টিকটুভাবে ভাবে কেন্দ্রীভূত।যদিও দেশে লোকবলের অভাব নেই। লোকবলকে কিভাবে সমন্বিত উপায়ে কাজে লাগানো যায়, সেটা ভাবতে হবে ।আমাদের তরুণ নাগরিক সমাজকে জনগণের সাহায্যে নিয়োজিত করা যায়। কোভিড ১৯ সংক্রমণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর্যায় পার করছে। সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য ভয়াবহ সংকটময় হতে যাচ্ছে।আমাদের সীমিত আর্থিক ও চিকিত্সা অবকাঠামোগত সামর্থ্য নিয়ে নজিরবিহীন দূর্যোগের মুখোমুখি।
দেশের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও চিকিত্সা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে চিকিত্সক ও নার্সদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুরক্ষার ঘাটতিতে চিকিত্সকদের মধ্যেযে অসন্তোষ রয়েছে তা দূর করার ব্যবস্থা নেয়া উচিত।এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দিতে গিয়ে অন্তত ১০০ জন চিকিত্সক ও নার্সের মৃত্যু ঘটেছে, শুধু ইতালিতেই সংখ্যাটি ৬০। ইন্দোনেশিয়ায় মারা গেছেন ১৮ জন চিকিত্সক(সুত্র-দা গার্ডিয়ান)।
আমাদের সরকারী স্বাস্থ্যসেবার ভৌত অবকাঠামো যথেষ্ঠ ভালো না হলেও চলনসই। মোট জন গোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি এখনো সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকের কাছে যায়। কমিউনিটি ক্লিনিক এর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়েই নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বেশ সক্রিয় ।সরকারী ও এনজিওভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিটি বাড়িতে যেতে পারেন। কিন্তু যথাযথ নজরদারি ও সুব্যবস্থাপনা না থাকায় এগুলোর সুফল তৃণমূলে দৃশ্যমান হয় না।স্বাস্থ্যসেবা সবার কাছে পৌঁছানো সম্পদের সীমাবদ্ধতার উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। ধারাবাহিক নীতি সহায়তার সাহায্যে কমিউনিটি স্ত্তর থেকেই একটি নিরবিচ্ছিন্ন নীরোগ স্বাস্থ্য কাঠামো তৈরি করা, যাতে দেশের জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ন্যুনতম পর্যায়ে রাখা যায় একইসাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যায়।
দ্বৈত উদ্বেগের করাল থাবার নীচে এখন গোটা দুনিয়া। একটি নয় দুটি মহামারির শিকার বর্তমান বিশ্ব। প্রথমটি কোভিড-১৯ মহামারি- ১০০ দিনেই লাখ খানেক মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে যা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সবাইকে। আর অন্যটি হচ্ছে, মহামারীজনিত ধসে পড়া অর্থনীতি যা শত বছরের ইতিহাসে তুলনারহিত।। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বাস্তুসংস্থান এবং জীববৈচিত্রের প্রফেসর কেট জোন্স বন্য প্রাণী থেকে মানবদেহে এ রকম রোগের সংক্রমণকে ‘মানবের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হিডেন কস্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।বিশেষ শ্রেণীর স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে তার দায় মেটাচ্ছে অজস্র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
এম এম খালেকুজ্জামান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট