এ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়

অদ্ভুত এক নীরবতায় আচ্ছন্ন ঢাকা। ১১০-১২০ ডেসিবলের শব্দদূষণ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে। বাতাসে পিএমের মাত্রাও অনেক নিচে নেমে এসেছে। সুইসভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজুয়ালের তথ্য মোতাবেক বায়ুদূষণে শীর্ষে অবস্থানকারী ঢাকা এখন ২৩ নম্বরে।

অদ্ভুত এক নীরবতায় আচ্ছন্ন ঢাকা। ১১০-১২০ ডেসিবলের শব্দদূষণ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে। বাতাসে পিএমের মাত্রাও অনেক নিচে নেমে এসেছে। সুইসভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজুয়ালের তথ্য মোতাবেক বায়ুদূষণে শীর্ষে অবস্থানকারী ঢাকা এখন ২৩ নম্বরে। মানুষের ছোবলে, দংশনে নির্যাতিত প্রকৃতি যেন জীবন ফিরে পেয়েছে। অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা চোখে পড়েছে। রাজধানীতে দলবেঁধে সশব্দে টিয়া পাখি উড়ে যাচ্ছে। ঘুঘুর অবিরাম ডাক শোনা যাচ্ছে। বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে চিল খুব নিচু দিয়ে মহাআনন্দে উড়ে যাচ্ছে। অলিগলিতে বেজি ছোটাছুটি করছে। যেন অচেনা-অজানা এক ঢাকা। প্রাকৃতিক নিয়মে এভাবেই মানুষ পশুপাখি, কীটপতঙ্গ একে অন্যের অনুষঙ্গ। পুরো পৃথিবীই অদ্ভুত ছন্দময়। আমাদের জীবন ছন্দময়। নদী-পাহাড় প্রকৃতি ছন্দময়। বাতাসের বেগ ছন্দময়। সমুদ্রের ঢেউ ছন্দময়। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ছন্দময়। হূিপণ্ডের গতি ছন্দময়। কিন্তু ছন্দময়তার পতন ঘটিয়েছে মানুষ। ছন্দপতনে বিপর্যস্ত প্রকৃতি-পরিবেশ। করোনাভাইরাসে এখন ইমারতবন্দি মানুষের কান্না, কিন্তু প্রকৃতিজুড়ে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। থেমে গেছে নগরীর স্পন্দন, কিন্তু আনন্দে মুখরিত প্রাণ-বৈচিত্র্যের জীবন। প্রকৃতি যেন অধিকার ফিরে পেয়েছে। প্রকৃতি মানুষের বন্ধন ভেঙে মানুষই সৃষ্টি করেছে বৈরিতা, শত্রুতা। মানুষের নীরবতায় রাজধানীর ভবনগুলো যেন সমাধিক্ষেত্র। মানুষের কোলাহল নেই। গভীর রাতেও ঢাকায় এমন নিঃশব্দতা থাকে না। ভোগবাদিতার চরমে পৌঁছে মানুষ লণ্ডভণ্ড করেছে প্রকৃতি, পরিবেশ। মানুষ ছাড়া যেন আর কারো অধিকার নেই। সর্বত্রই মানুষের জয়জয়কার, অত্যাচার। কিন্তু অদৃশ্য এক ভাইরাস থেকে বাঁচতে থমকে গেছে মানুষের কোলাহল, চলাচল। সুযোগে প্রাণবৈচিত্র্য, প্রাণপ্রকৃতি হয়েছে প্রাণোচ্ছল। স্বার্থপরতায় আক্রান্ত মানুষ বিস্মৃত হয়েছে পরার্থপরতা। তার চাওয়া-পাওয়া অসীম। ভোগে সে বিলীন। ভোগ আর প্রবৃত্তির দাসত্ব করে মানুষ নামক প্রজাতি সর্বনাশ করেছে প্রকৃতির। বিজ্ঞানের উদ্ভব প্রকৃতি থেকে। বিজ্ঞান প্রকৃতি একে অন্যের সঙ্গী। কিন্তু বিজ্ঞান দিয়ে সব আয়ত্ত করতে যেয়ে মানুষ প্রকৃতিকে বিপন্ন করেছে। মানুষের জন্য প্রকৃতিকে উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। প্রাণপ্রকৃতির কোলাহল স্তব্ধ করেছে যে মানুষ, সে মানুষ করেনাভাইরাসের থাবায় আজ নিস্তব্ধ। কী অদ্ভুত নিয়তি মানুষের! নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র যেন অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর হয়েছে। পুরো দুনিয়াজুড়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক সব কর্মকাণ্ড এখন অচল, স্থবির। বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের খেতাবপ্রাপ্ত ফিনল্যান্ডেও হানা দিয়েছে ভাইরাস। মানুষের কিসের এত আত্মাভিমান, এত অহংকার? মাটির তৈরি মানুষ। পৃথিবীকে প্রাণের বৈচিত্র্যে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়েছেন মহান স্রষ্টা আল্লাহ। মানুষই ভারসাম্য নষ্ট করেছে, সংকট তৈরি করেছে। মানুষ প্রাণীর প্রতিযোগিতায় মানুষ জয়ী হয়েছে। কারণ মানুষের হাতে আছে জ্ঞান-বিজ্ঞান মেধা। মানুষ সংকুচিত করেছে প্রকৃতিকে। অথচ মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস প্রকৃতি। পুরো পৃথিবীই মানুষের অপরিণামদর্শী আচরণের ক্ষতচিহ্ন বহন করছে। মানুষ নিজেদের বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। অন্যদেরও বাসযোগ্যতা বিনষ্ট করছে। রাজধানী ঢাকায় সবুজ আস্তরণ হারিয়ে যাচ্ছে। কংক্রিট দিয়ে সব আবৃত করে ফেলেছি। সামান্য কিছু পাখির আবাসস্থল আছে ঢাকায় অথচ কংক্রিটের জঙ্গলে তাদের খাবার নেই, পানি নেই। আমরা ভাবি না অন্যদের কথা, ব্যথা বেদনা, যাতনা। এভাবে নিজেদের অসুস্থ করেছি, অন্যদের বিপন্ন করেছি। করপোরেট শক্তির ফ্ল্যাট বাণিজ্যে বিধ্বস্ত প্রকৃতি। এমনকি ঢাকার কাছেই জলাশয় গ্রামগুলো হাউজিং কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে। অথচ কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে আরব আমিরাত মরুভূমির বুকে জলাশয় তৈরি করছে। ঢাকা শহরে প্রচণ্ড শব্দদূষণে নিরীহ চড়ুই পাখিও কমছে। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে তাদের ছায়া হারিয়ে যাচ্ছে। ডাহুক হারিয়ে যাচ্ছে। কোয়াক কোয়াক ডাকও শোনা যায় না। প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ ডাহুককে নিয়ে লিখেছেন, নিদাঘের রৌদ্র তাপে একা সে ডাহুকী, বিজন তরুণ শাখে ডাকে ধীরে ধীরে।

এদিকে আরেক বিরল ঘটনার অবতারণা ঘটেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। পর্যটকশূন্যতায় সৈকতজুড়ে চলছে ডলফিনের লাফালাফি-দাপাদাপি। সুনীল সমুদ্রের বুক চিরে লাফিয়ে উঠছে দলে দলে ডলফিন, সমুদ্রের বুকজুড়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ডলফিনের আনন্দ উচ্ছ্বাস জানান দিচ্ছে ওরা এখন মানুষের উপদ্রবমুক্ত। মানুষ এখন গৃহবন্দি, ডলফিনদের যেন কারামুক্তি। যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ। তারা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে বুক ভরে অক্সিজেন নিতে পারছে সাগরে। একাকিত্বের বন্দিত্বের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষ দেখছে, পাখি-প্রকৃতি-ডলফিন আজ কত সুখী, দেখছে তাদের দুরন্ত ছোটাছুটি। মানুষ বুঝছে না, পৃথিবী মানুষের একার নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রে টুনা মাছের ভান্ডার শেষ হয়ে যাচ্ছে। গত ৬০ বছরে সাগরে টুনা আহরণের পরিমাণ ১০০০ শতাংশ বেড়েছে। কী অদম্য লোভ মানুষের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেড়েছে টিনজাত মাছের চাহিদা, ফলে টুনার দুরবস্থা। জগত্জুড়েই মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি এবং সবকিছুতে বাণিজ্য দৃষ্টিভঙ্গি গবেষকরা বলছেন, সাগর-মহাসাগরের প্রতি বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে ১০০ গ্রাম ওজনের মানুষের নিক্ষিপ্ত প্লাস্টিক বর্জ্য। দলে দলে সামুদ্রিক মাছ, প্রাণী পাখি খাবার মনে করে গিলে খাচ্ছে প্লাস্টিক। এরপর ফুড চেইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঢুকছে আমাদের পেটে।

ঢাকায় এখন নীল আকাশ, মায়াবী চাঁদ। শশব্যস্ত প্রবাহিত জীবনে অদ্ভুত এক ছন্দপতন। নেই শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, বর্জ্যদূষণ। নেই যানবাহন, নেই ধোঁয়া উদগিরণ। কক্সবাজার আর ইনানী সৈকতজুড়েও এখন এক আশ্চর্য নীরবতা। কক্সবাজারের ডলফিন আর ঢাকার ঘুঘু পাখিরা যদি প্রার্থনা করে, মানব প্রজাতির করোনাসৃষ্ট দুঃসময় যেন প্রলম্বিত হয় আরো দীর্ঘ সময়, তবে তাদের মুক্ত বিচরণ হবে আরো দীর্ঘ আনন্দময়। না, আমরা তা কামনা করি না। আমরা চাই বঙ্গোপসাগরে ডলফিনের আর রাজধানীজুড়ে পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত হোক। করোনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত মানুষকে শপথ নিতে হবে, সে দূষণ ছড়াবে না, প্রকৃতিকে বিনষ্ট করবে না, পরিবেশের বিনাশ ঘটাবে না ঘটনা মানুষের জন্য কঠোর বার্তা দিচ্ছে, পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। সবারই বেঁচে থাকার, ঘুরে বেড়ানোর, শ্বাস নেয়ার এবং আনন্দ করার অধিকার আছে। প্রকৃতির নিয়ম ধারায় ফিরে আসুক নীল আকাশ, প্রবাহিত হোক বিশুদ্ধ বাতাস। প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় সুরক্ষিত হোক ডলফিন, ডাহুক আর ঘুঘুর বসবাস। করোনা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, প্রাণপ্রকৃতি আমাদের আত্মার বন্ধন, একান্ত আপনজন।

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

মহাপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান প্রযুক্তি জাদুঘর

আরও