ভুল দেশে জন্মানোর প্রায়শ্চিত্ত

এই করোনাকালে ডা. মইন কে ছিলেন এটা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রযোজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে ডাক্তারদের অনেকেই চিকিৎসা দিতে দ্বিধান্বিত, এমন সময়ে করোনাক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি ডা. মইন। যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ করার পরিণতি ভাবেননি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে রোগী কাতরাচ্ছে, তাদের সাহায্য দরকার, এর বেশি কিছু ভাবার প্রয়োজনও বোধ করেননি।

“Is it possible for me to arrange ICU ambulance to transfar me kuit hospital”, এই কথাটি ঘুরছে ফেসবুক ব্যাবহারকারীদের ওয়ালে ওয়ালে। এটি ছিল ম্যাসেঞ্জারে কাউকে পাঠানো অকালে বিদায় নেয়া ডা. মইন উদ্দিনের পাঠানো আকুতি। এর সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে অবিশ্বাস্য মনে হয় না। আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে যেন ঢাকায় নেয়া হয় এই আকুতি জানিয়েছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মইন। মনে রাখতে হবে নিজেকে ভিআইপি ভাবেননি ডা. মইন। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কিন্তু চাননি।

এই করোনাকালে ডা. মইন কে ছিলেন এটা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রযোজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে ডাক্তারদের অনেকেই চিকিৎসা দিতে দ্বিধান্বিত, এমন সময়ে করোনাক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি ডা. মইন। যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ করার পরিণতি ভাবেননি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে রোগী কাতরাচ্ছে, তাদের সাহায্য দরকার, এর বেশি কিছু ভাবার প্রয়োজনও বোধ করেননি।

প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থা ছাড়াই নিজেদের যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো নির্বুদ্ধিতা না হঠকারিতা সে বিতর্ক না হয় বাদই দেয়া গেল। করোনাক্রান্তদের আর্তনাদে জীবনবাজী রেখে চিকিৎসা সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন ডা. মইন। আক্রান্ত হলেন নিজেও। এরপর তিনি যে ভয়াবহ মানসিক নির্যাতনের মধ্যে পড়লেন, সেটাই আসলে আমাদের স্বাধীন দেশ! নিজে যে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন সেই হাসপাতালে তার জায়গা হয়নি। ডা. মইনের স্বজনদের ইচ্ছার কোনো মূল্যও দেয়া হয়নি। নিজের চিকিৎসার জন্য সিলেট মেডিকেলে আইসিইউ বেড পাননি ডা. মইন। তার জায়গা হয় শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে। বলাবাহুল্য ওখানে আইসিইউ ছিল না। 

নিজের ফেসবুক স্ট্যটাসে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ঢাকায় নেয়ার আকুতি জানান ডা. মইন। এই সামান্য চাওয়াটুকু কপালে জোটেনি। সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সেই সিলেট থেকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে আসতে হয় তাকে। আট দিনের লড়াই শেষে অনন্তলোকের সান্নিধ্যে মিশে গেলেন ডা. মইন। আক্রান্ত হতে পারেন এ ঝুঁকি নিয়েই দেশের মানুষকে সেবা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কেন জীবনকে তুচ্ছ বিবেচনা করেছিলেন এই স্বার্থপর প্রশ্নটা কখনোই নিজেকে করেননি মেডিকেল কলেজের এই অধ্যাপক। 

ডা. মইনের মৃত্যুর পর শুরু হয়েছে তোড়জোড়। শোকবার্তা পাঠানোর প্রতিযোগিতা চলছে। শোকবার্তা পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তার মৃত শরীর সিলেটে নেয়া হচ্ছে হেলিকপ্টারে করে। আরো কত কি আয়োজন মৃত ডা. মইনকে নিয়ে! এ যেন সেই গল্পের মতো- বিনা চিকিৎসায় মারা গেল ছেলের বউ। মারা যাওয়ার পর অকাল প্রয়াত বধুকে দাহ করা হলো ঘি-চন্দন কাঠ সহযোগে। বংশের মান-সম্মান বলে কথা!

ডা. মইনের ঘটনায় কী বার্তা পেল দেশবাসী

গত মাসের শুরুর দিকে, করোনা যখন আমাদের দেশে উঁকিঝুকি দিচ্ছিল, ওই সময় আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের সবাই জোর গলায় বলেছেন, সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। করোনা আমাদের কিছুই কিরতে পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। মার্চজুড়ে বিদেশ থেকে হাজারে হাজারে মানুষ অবাধে দেশে ঢুকে পড়ল, তখনো গলাবাজী থামেনি তাদের। বিদেশ থেকে বিমানবন্দর হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল করোনা। বেরিয়ে পড়ল থলের বেড়াল। বাস্তবে কিছুই নেই। টেস্ট করার কিট নেই। ডাক্তারদের পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) নেই। হাসপাতাল প্রস্তুত নেই। 

গণপরিবহন চালু রেখে নেয়া হলো ছুটির সিদ্ধান্ত। গণপরিবহনে গাদাগাদি করে মানুষ ঢাকা ছাড়ল। এরপর গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে তামাশা। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পায়ে হেঁটে ঢাকায় এলো। আবার তারা ফিরেও গেল। দেশব্যাপী করোনা ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হলো। যখন পরিস্থিতি নাগালের বাইরে, শুরু হলো কড়াকড়ি। হুমকি ধমকি দেয়া শুরু হলো ডাক্তারদের। কাজ করার পরিবেশ আছে কি-না সে জবাব কে চাইবে আর কেইবা দেবে? 

এদিকে দেশব্যাপীই ত্রাণের নামে চলছে লুটের মচ্ছব। চাল চোরদের কেউ কেউ ধরা পড়ছে, হাততালিও পাচ্ছে প্রশাসন।  দুস্থ মানুষদের জন্য পাঠানো ত্রাণের চাল লুট কীভাবে সম্ভব এর কোনো জবাব হয় না?  সব কথার এক কথা- গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা আর অব্যস্থাপনা প্রতিটি স্তরে। 

করোনাক্রান্তিতে বাংলদেশের ঘোর অমানিশায় আশার বাতি জ্বালিয়েছিলেন ডা. মইন। শুধু চিকিৎসকরাই নয়, ডা. মইনের লড়াকু মানসিকতা প্রেরণা জুগিয়েছিল অনেককেই। চিকিৎসক আর সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গাটি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ডা. মইনের ভূমিকা অনেকাংশেই হয়ে ওঠে প্রভাবক। কিন্তু দায়িত্বহীনতা আর অব্যবস্থাপনা দিয়ে যে ভালো কিছু  টিকিয়ে রাখা যায় না, সেটিই নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়াল।

ডা. মইনের মৃত্য শুধু একটি ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়, সঙ্গে একটি প্রেরণারও মৃত্যু। চরম অবহেলা আর অব্যবস্থনার প্রায়শ্চিত্ত কাউকে না কাউকে করতেই্ হয়, সে সত্যটিকেই যেন স্মরণ করিয়ে দিলেন ডা. মইন।

লেখক: সাংবাদিক

আরও