বাংলাদেশ ও তার জনগণ আজ এক ক্রান্তিকাল পার করছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে, কত কম মূল্য দিয়ে একটি সহনীয় ভবিষ্যৎ (সেফ ল্যান্ডিং) আমরা নিশ্চিত করতে পারব? আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত ও কাজ আমাদের সবার যাত্রাপথ ও গন্তব্য চূড়ান্ত করে দেবে।
স্বীকার করি বা না করি, সামাজিক দূরত্ব নামের ঢিলেঢালা কার্যক্রম ‘দৈহিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভাইরাস সংক্রমণের ‘যোগাযোগ শৃঙ্খল’ আমরা এখনো ভেঙে দিতে পারিনি; বরং সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, হালকা মেজাজের কর্মসূচি সত্ত্বেও।
দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতেই হবে। এতে যত বরাদ্দ দিতে হয়, দিন। ক্ষুধা ভাইরাসের চেয়েও মারাত্মক। ক্ষুধার্ত মানুষের পক্ষে লকডাউন মানা সম্ভব না। একটি মাত্র ঘরে পাঁচ-ছয়জন ঘুমানো ও দূরে অবস্থিত এজমালি টয়লেট ব্যবহার করেই যাদের বাঁচতে হয়, তাদেরকে অভুক্ত রেখে সামাজিক দূরত্বের গল্প করা হাস্যকর হবে।
অনুমিতভাবেই, স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মধ্যে ভাইরাস ঢুকে পড়েছে। পিপিই সরবরাহের ক্ষেত্রে আনাড়িপনা ও শৈথিল্য আমাদের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির মনোবল ভেঙে দিতে বসেছে। ‘কেয়ামত পর্যন্ত একজনের জন্য একটি পিপিই—একটি অগ্রহণযোগ্য নীতি, চরমভাবে আত্মঘাতী। নতুন বরাদ্দ ও ব্যাবস্থাপনা চাই, এখনই। নইলে সর্বনাশ সুনিশ্চিত।
ওয়ালটন নামের একটি প্রতিষ্ঠান অতিপ্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাপণ্য, ভেন্টিলেটর দেশে বসেই তৈরি করছে। কাজটির গতি বাড়ানোর পদক্ষেপ কি নেয়া সম্ভব? এতে স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে কি? আশা করি কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে জানে যে উপযুক্ত সুরক্ষা পোশাক পরা স্বাস্থ্যসেবাকর্মী আর ভেন্টিলেটর পেলে অসুস্থ রোগীদের সেবা দেয়াটা সহজতর হবে।
যখনই সরকারি ঘোষণার ছুটি (এ যাত্রায় এপ্রিলের ২৫ তারিখ নাগাদ) শেষ হবে, আবার লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় ফিরে আসার পথ ধরবে। ছুটি শেষ হলে এটা অনিবার্য। এবার আশা করি সরকার কৌশলী হবে, একসঙ্গে ভিড় করার সুযোগ যাতে কমে যায়। পরিকল্পনা করতে হবে এখনই। ভিড় হয়ে গেলে কোনো পরিকল্পনা কাজ করে না।
বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। এ ধান দেশে উৎপাদিত শর্করা ফসলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তদুপরি, চাল তুলনামূলক মোটা হওয়ায় তা আপামর দরিদ্র মানুষের সাংবৎসরিক খাদ্যের চাহিদা মেটায়। বোরো ধান তাই আমাদের দেশের ভালো-মন্দ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হাওড়ে ধান পাকে সবার আগে, যে সুযোগ আসবে এপ্রিলের ২৫ তারিখ নাগাদ। যদি আবহাওয়া শুষ্ক থাকে, জমির উচ্চতাভেদে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত ধান কাটা চলবে। তবে ৭০-৮০ শতাংশ মতো পেকে গেলে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলেই কৃষক ধান কেটে তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবেন। আধুনিক যন্ত্র দিয়ে ধান কাটার সুযোগ হাওড়ের ভূপ্রাকৃতিক গঠনের কারণে সীমিত হয়ে পড়ে। এজন্য হঠাৎ বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিক নিয়োজিত করতে হয়। নতুবা পাহাড়ি ঢলে পুরো ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ওই সময় স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি শ্রমিক হাওড়ে পাওয়া যায় না, যেহেতু হাওড়ের জনঘনত্ব সবচেয়ে কম। অন্যান্যবার ভোলাগঞ্জে পাথর কোয়ারিতে যাওয়া শ্রমিকরা এবার যদি এলাকাতেই থাকেন, তবু ধান কাটার জন্য শ্রমিকের বাড়তি জোগান লাগবেই।
মুশকিল হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শ্রমিকরা শ্রম বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে জড়ো হবেন এবং হাওড়ে ছুটতে চাইবেন। আগেভাগে শনাক্তকরণের (টেস্ট) ব্যর্থতায় তাদের কেউ কেউ হয়তো না জেনেই করোনা বহন করবেন এবং সংক্রমণের বাহক হবেন। হাওড়ে পৌঁছানোর পর তারা থাকবেন গাদাগাদি করে (শখে নয়!), যা সংক্রমণের ব্যাপ্তি বাড়াবে। তাহলে সমাধান কোথায়? আমরা জানি যে হাওড়ের উদ্বৃত্ত ধান শহরের দরিদ্রদের সারা বছরের মোটা চালের জোগান দেয়। ওই ধান বৃষ্টিতে তলিয়ে যেতে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যথায় তা হবে আত্মহননকারী সিদ্ধান্ত। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এতে ভেঙে পড়বে।
আমরা নিশ্চয়ই ২০০৮-এর সংকট ভুলে যাইনি। আমরা শিখেছি যে বিলিয়ন ডলারের মজুদ সময়মতো খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং ডলার চিবিয়ে খেলে ক্ষুধা কমে না।
বৃষ্টি আসার আগে হাওড়ের ধান কেটে তোলার উপায় খুঁজতে হবে, এজন্য পরিকল্পনাও সাজাতে হবে। প্রথমত, সুযোগপ্রত্যাশী কৃষি শ্রমিকের অভিগম্যতা (মবিলিটি) পরিকল্পিতভাবে এপ্রিল ২০ আসার আগেই নিশ্চিত করতে হবে। যদি তা না করা যায় এবং যদি আগাম বৃষ্টি এসেই পড়ে, হাওড়ে আমাদের কৃষককুল তৈরি হওয়া ফসল ঘরে তুলতে পারবেন না। কৃষি শ্রমিকের যাত্রাপথ কি করোনামুক্ত করা যাবে?
বেশির ভাগ কৃষি শ্রমিক রংপুর বিভাগ থেকে ধান কাটার জন্য হাওড়ে যান। বহু গবেষণার উপাত্ত থেকে এটা এখন সবার জানা হয়েছে। রংপুর বিভাগের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে অভিগমনপ্রত্যাশীদের তালিকা তৈরি করে করোনা পরীক্ষা করা হোক (কয়েক দিনের মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সুলভ ও সহজলভ্য পরীক্ষা কিট হাতে এসে পৌঁছানোর কথা, সেগুলোই না-হয় ব্যবহার করা হোক)। যারা সুস্থ বলে রায় পাবেন, তাদের তাত্ক্ষণিক ছবিযুক্ত সুস্বাস্থ্য সনদ দিয়ে অভিগমন অনুমতিপত্র দেয়া হোক। তাহলে ঝুঁকিবিহীন কর্মে নিয়োজন নিশ্চিত হবে, উদ্দেশ্যও সিদ্ধি হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে সুশৃঙ্খলভাবে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব।
এরই মধ্যে গন্তব্যের উপজেলাগুলোয় স্কুলগুলোকে কৃষি শ্রমিকদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে তৈরি রাখা হোক। করোনামুক্ত কৃষি শ্রমিকরা ওখানেই থাকবেন, স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি যোগাযোগ যত সীমিত রাখা যায় তত মঙ্গল। তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হোক। যদি কাউকে করোনাঘটিত রোগের লক্ষণসহ দেখা যায়, তাকে এবং সঙ্গীদের আবারো করোনা পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনে অসুস্থদের কোয়ারেন্টিন করা হোক। এসব বিষয় একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় আনা হোক।
যদি ১৮-২০ এপ্রিলের মধ্যে পরিস্থিতি এমনই হয় যে কৃষি শ্রমিকের হাওড়মুখী অভিগম্যতা বাতিল করে দিতে হয় (সংক্রমণ অত্যধিক ছড়িয়ে গেলে) তাহলে প্ল্যান-বি কার্যকর করা হোক। স্থানীয় পর্যায়ের আনসার-ভিডিপি সদস্যদের ধান কাটার কাজে সরকারি মজুরি দিয়ে নিয়োজিত করা হোক। তাদের ধান কাটার দক্ষতা হয়তো কৃষি শ্রমিকের তুল্য হবে না, সময়ের খানিকটা অপচয় হবে, তবু এসব প্রচেষ্টা খানিকটা সুফল দেবে। আর তাদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পরীক্ষা, আইসোলেশন ইত্যাদি যা যা করণীয়, তা সঠিকভাবে করা হোক যেন নভেল করোনাভাইরাস হাওড়ের হাটিগুলোয় ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
আর যতদিন দুর্যোগটা থাকবে ততদিন যথাযথভাবে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও শহর ও গ্রামের মানুষদের ঘরে রাখা হোক। যদি পুরো দেশের ধান কাটা শুরুর আগে করোনামুক্ত করা সম্ভব না হয়, আমাদের করোনা ও ক্ষুধা উভয়ের সঙ্গে লড়তে হবে। বলা বাহুল্য, দরিদ্রদের ওই যুদ্ধে জিতে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফল গ্রহণযোগ্য নয় বলেই শক্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে।
যা করতেই হবে, তা করতে গিয়ে যেন দ্বিধা না করি। আমতা আমতা সিদ্ধান্ত আমাদের ক্রমাগত পিছিয়েই দেবে। এপ্রিলেই করোনামুক্ত হতে চাইলে বরং কারফিউ দিন। এ দেশের গণমানুষ নতুন শব্দ, নতুন আচার-আচরণ (যেমন হোম কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব) তেমন চেনে না। সরি। ওসবে আর চলছে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো যুদ্ধ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধ করা বাঙালির কাছে যুদ্ধের মধ্যে ‘কারফিউ’ নতুন কিছু নয়। তা-ই না হয় প্রয়োগ করা হোক। সশস্ত্র বাহিনী এখন মাঠে। তাদের ক্ষমতায়িত করে আমরা বরং ঘরে খিল দিয়ে আপত্কালীন সময়টুকু পার করি। এর মধ্যে দয়া করে নিরন্ন মানুষের মধ্যে খাবারটুকু পৌঁছে দিন।
মানুষকে অভুক্ত রেখে, করোনায় বেঘোরে কষ্ট পেয়ে মরতে দেখে জীবিতদের মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ দেখতে ভালো লাগবে না। জনপ্রতি জিডিপি আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এখন বড় বিষয় নয়। মানুষ বাঁচানোই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
আমরা সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই।
আহসান উদ্দিন আহমেদ: গবেষক; জাতিসংঘের আওতাধীন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বাধীন কারিগরি পরামর্শক প্যানেলের সদস্য