পেশায় অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার প্রমোদ গৌতম ২০১৭-১৮ সালে পুরোপুরি ফল চাষ শুরু করলেন। কমলা, পেয়ারা, লেবু, কাঁচকলা, মিষ্টি লেবু ও ডাল চাষ শুরু হয়। পাশাপাশি নিজস্ব কারখানা তৈরি করলেন। তার ক্ষেতে উৎপাদিত ডাল তিনি ‘বন্দনা’ ব্র্যান্ডে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন। এখন এ ডালপণ্য বাজারজাত করেই তার বার্ষিক লেনদেন দাঁড়িয়েছে কোটি রুপির বেশি। এছাড়া বাগান থেকে আসছে আরো ১০-১২ লাখ রুপি
খরা, ঋণ, অসময়ে বৃষ্টিপাত অথবা অতিবৃষ্টি, উৎপাদনে
মন্দা, বাজারে নিম্নমূল্য;
এমন সব দুর্ভোগ যেন কৃষকের নিত্যসঙ্গী। আর সে
কারণেই হয়তো বেশির ভাগ মানুষ তার সন্তানদের কৃষিকাজে উৎসাহ দেন না। বরং ছোটবেলা
থেকে মনের মধ্যে ডাক্তার, আইনজীবীর মতো অভিজাত পেশায় যাওয়ার স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে থাকেন। যাতে
করে তারা সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এগুলোই কি কেবল সফল হওয়ার
একমাত্র উপায়? এর বিপরীতে কৃষিকাজ করেও যে সফল হওয়া যায়, সেটি
দেখিয়েছেন ভারতের পাঁচজন কৃষক।
প্রমোদ গৌতম: পেশায়
ছিলেন একজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার। তবে সময়টা ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত। এখন তিনি একজন
পুরোদস্তুর কৃষক। বছরে কৃষি খাতকে কেন্দ্র করে তার ব্যবসায়িক লেনদেন কোটি রুপিরও
বেশি। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। চাকরিতে মানসিক শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না গৌতম। তাই
চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজে মনোযোগ দিতে মনস্থির করলেন তিনি। পৈতৃক ২৬ একর জমিতে আধুনিক
পদ্ধতি ব্যবহার করে চাষাবাদ শুরু করলেন। প্রথমে চীনাবাদাম ও হলুদ রোপণ করলেন।
কিন্তু সেটিতে তিনি লাভের মুখ দেখলেন না। কিন্তু হতাশ না হয়ে নতুন ফসল চাষের কথা
ভাবলেন। কারণ শ্রমিক সংকটে ফসল ফলিয়ে লাভ তুলতে পারছিলেন না। এ কারণে শুরু করলেন
স্মার্ট কৃষি। যেখানে ফসল উৎপাদনে তেমন শ্রমিক নির্ভরতা নেই। যেমন তিনি চালক ছাড়া
ট্রাক্টর ব্যবহার করলেন। এখন এটি অহরহ ব্যবহার হলেও সে সময় এটি তেমন দেখা যেত না।
তবে সে সময় ট্রাক্টর কিনতেও হতো না। অল্প খরচে ভাড়া নেয়া যেত। ২০১৭-১৮ সালে গৌতম
পুরোপুরি ফল চাষ শুরু করলেন। কমলা,
পেয়ারা,
লেবু,
কাঁচকলা,
মিষ্টি লেবু ও ডাল চাষ শুরু করলেন। পাশাপাশি
নিজস্ব কারখানা তৈরি করলেন। তার ক্ষেতে উৎপাদিত ডাল তিনি ‘বন্দনা’ ব্র্যান্ডে
বাজারে বিক্রি করতে শুরু করলেন। এখন এ ডালপণ্যে বাজারজাত করেই তার বার্ষিক লেনদেন
দাঁড়িয়েছে কোটি রুপির বেশি। এছাড়া বাগান থেকে আসছে আরো ১০-১২ লাখ রুপি।
ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার চেয়েও এখান থেকে তিনি এখন বেশি আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন।
শচিন কেল: গৌতমের
মতো শচিন ছিলেন একজন যন্ত্র প্রকৌশলী। বসবাস নাগপুর। সেখানে একটি পাওয়ার প্লান্টে
কাজ শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তা বনে গেলেন শচিন।
বছরে তার আয় ছিল ২৪ লাখ রুপি। কিন্তু বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে কৃষক হওয়ার নেশায় ছুটে
এলেন ছত্তিশগড়ের গ্রামের বাড়িতে। বড় কর্মকর্তা হলেও কৃষিতে তাকে একেবারে শিখতে
হয়েছে শুরু থেকে, যা তার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু দমে যাননি। কয়েক বছর পর নিজের ১৫
বছরের প্রভিডেন্ট ফান্ড ভেঙে ক্লিন এনার্জি মডেল তৈরি করলেন, যা
থেকে নিজের খামার ছাড়াও অন্যদের কাছে বিক্রি করে লাভবান হন তিনি। ২০১৪ সালে ‘ইনোভেটিভ
এগ্রিলাইফ সলিউশন প্রাইভেট লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষকদের চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ
সরবরাহ ও পণ্য বাজারজাতে যা সহায়তা করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ১৩৭ জন কৃষক এবং
২০০ একর জমির ফসল নিয়ে কাজ করছেন। এ থেকে বছর শেষে তার লেনদেন হচ্ছে ২ কোটি রুপি।
হারিশ দান্দেভ: আরেক
প্রকৌশলী হরিশ দান্দেভ একেবারে সরকারি ছেড়ে নেমে পড়লেন অ্যালোভেরা উৎপাদনে।
রাজস্থানের জয়সালমারের পৈতৃক জমিতে চাষ শুরুর আগে কৃষি বিভাগ থেকে মাটি পরীক্ষা
করেন তিনি। তারা ছাপ জানিয়ে দিলেন এ মাটিতে সবজি ও ডালজাতীয় ফসল উৎপাদন করা যাবে।
কিন্তু তিনি অনেকটা উল্টো পথে হেঁটে চাষ করলেন অ্যালোভেরা। কারণ জয়সালমারে এটির
বাজার ধরা যাবে বলে এ চাষে এগিয়ে আসেন তিনি। অনলাইন থেকে ধারণা নিয়ে প্রথমে ৮০
হাজার চারা রোপণ করলেন। অল্প সময়েই তা সাত লাখে রূপান্তর হলো। এছাড়া দেশীয় ও
আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে তিনি অনলাইনে পণ্য বিক্রি শুরু করলেন। লাভ বাড়াতে
অ্যালোভেরার পাল্প তৈরি করলেন। কয়েক বছরে আরো জমি
কেনেন তিনি। এখন ১০০ একরেরও বেশি জমিতে তিনি অ্যালোভেরা চাষ করছেন।
রাজস্থান ও জয়সালমারেতেই তার অ্যালোভেরার ক্রেতা গড়ে উঠেছে। খুলেছেন দান্দেভ
গ্লোবাল গ্রুপ নামে প্রতিষ্ঠান। এখন তার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন দাঁড়িয়েছে
দেড় কোটি থেকে ২ কোটি রুপি।
বিশ্বনাথ বোবেদ: মহারাষ্ট্রের
একটি খরাপ্রবণ বিড জেলার কৃষক বিশ্বনাথ। তারপরও মাত্র এক একর জমি থেকে তার বার্ষিক
আয় ৭ লাখ রুপি। যদিও খরাপ্রবণ এলাকায় এটি প্রায় অসম্ভব। আর কৃষিতে লাভ করতে তিনি
বেছে নেন সমন্বিত চাষ পদ্ধতি। এছাড়া ক্ষেতে তারের বেড়া দিয়ে সেটিতে লতানো সবজি চাষ
করেন। অন্যদিকে ক্ষেতে সবসময় পানি সরবরাহ রাখতে পাইপলাইন দিয়ে পানি ছিটানোর
ব্যবস্থা করেন। এছাড়া আধুনিক বেড ফার্মিং এবং মালচিং পদ্ধতিতেও চাষাবাদ শুরু করেন, যা
তাকে অতিরিক্ত লাভে সহায়তা করে। আর অল্প জমিতে লাভ করতে মাত্র দুজন শ্রমিক নেন।
পাশাপাশি তিনি ও তার স্ত্রী দুজনে দিন-রাত পরিশ্রম করেন।
রাজীব বিট্টু: একজন
পার্টটাইম চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন রাজীব। এখন তিনি একজন পুরোদস্তুর
কৃষক। চাকরির চেয়েও বেশি উপার্জন তার। তবে তার কৃষিতে আসার পেছনে একটি চমত্কার
গল্প আছে। একবার তিনি তার তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান।
কিন্তু তার মেয়ে গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে মিশতে অনীহা প্রকাশ করে। গ্রামের ছেলে
হওয়ায় রাজীব মনে করলেন মেয়ের এমন চিন্তার পরিবর্তন আনা দরকার। আর সে কারণে নিজেই
নেমে পড়লেন কৃষিকাজে। অল্পদিনেই কৃষক বনে গেলেন। শুরুতেই রাঁচি শহর থেকে ৩২
কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে কিছু জমি লিজ নেন। কিন্তু জমি লিজের অর্থ শোধ করার
মতো কোনো টাকা না থাকায় এক-তৃতীয়াংশ ফসল মালিককে দেয়ার প্রস্তাবে চাষাবাদ শুরু করেন। ফসল উৎপাদনে
মালচিং, ডিপ ইরিগেশনের মতো আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে শুরু করেন।
ডিপ ইরিগেশনের ফলে খরচ ও পানির অপচয় কমিয়ে চাষাবাদ করা যায়। এছাড়া পলিথিনের আবরণ দিয়ে বীজ বপনের ফলে মাটির আর্দ্রতা স্বাভাবিক রাখা যায় এবং বীজকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। এভাবে দিন দিন চাষাবাদের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলেছেন তিনি। বর্তমানে ৩২ একর জমিতে সবজি ও ফলের চাষ করেন রাজীব। এ থেকে এখন তার বার্ষিক আয় ১৫ থেকে ১৬ লাখ রুপি।