একটা ভয়াবহ ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। বক্তৃতা মানেই আমাদের কাছে কাঠখোট্টা রসকষহীন নিরাবেগ একটা আলোচনা। বক্তা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিকর সব কথাবার্তা বলেন। আমরা সুদৃশ্য ফোল্ডিং চেয়ারে বসে বসে হাই তুলি। মাঝেমাঝে হাত তালি দিই। বক্তা আর দর্শকসারিতে বসা শ্রোতার মাঝে যে একটা যোগাযোগ হতে পারে, সেটা আমরা খুব বেশি ঘটতে দেখি না। অথচ ইউটিউবে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেড টক দেখতে পারে। চন্দ্রিল ভট্টাচার্য আজ তারাশঙ্কর, কাল বিভূতি,পরশু মতি নন্দীর সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘ সব আলোচনা করে যান কলকাতা ক্রিয়েটিভ সোসাইটির প্রোগ্রামগুলোতে। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনি। বক্তৃতার মধ্যে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানদের ক্রাউড ওয়ার্কের মতো যোগাযোগপ্রবণ হতেই হবে এমন কথা নেই। তবে বক্তৃতার উপস্থাপনভঙ্গির মধ্যেই থাকতে পারে একটা ম্যাজিক ম্যাগনেটিজম। শাহাদুজ্জামানের ‘এ জীবন লইয়া কী করিব ও অন্যান্য বক্তৃতা’ বইটার ৭ টা বক্তৃতার অধিকাংশই এই ম্যাগনেটিজমের জোরে মনোযোগ ধরে রাখে। তবে এক্ষেত্রেও যে এক্স ফ্যাক্টরটা দরকার ছিল সেটা—টার্গেট লিসেনার (শ্রোতা) বা এইক্ষেত্রে রিডার (পাঠক)।
ভার্সেটাইল সব বিষয়ে বইয়ে অনুলিখিত সাতটা বক্তৃতাকে আমরা মোটামুটি তিনটা ব্রড হেডিংয়ে ভাগ করতে পারি।
১. লেখালেখি নিয়ে নিজের যাত্রা আর বর্তমান সময়ের সাহিত্যের প্রবণতা
২. সমাজ ভাবনা
৩. শিল্প ভাবনা
লেখালিখি নিয়ে নিজের সফরের বিষয়ে দুটো বক্তৃতা আছে।
‘এ জীবন লইয়া কী করিব’ আর ‘বিশ্বায়নের কালে লেখালিখি’ এই দুই শিরোনামে গড়ে ২৩ পৃষ্ঠায় শাহাদুজ্জামান যেন খুঁজে চলেছেন নিজেরই প্রশ্নের উত্তর। মেডিকেল লাইফ ছেড়ে ফিল্ম অ্যাপ্রিশিয়েশন সোসাইটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-শহীদুল জহির আর তারেক মাসুদের সান্নিধ্য,ক্রিয়েটিভিটির পুঁজি, অ্যাটেনশন আর বাহবার লোভ,আইডিওলজিক্যাল পজিশনের সীমাবদ্ধতা, লেখালিখির ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গীর গুরুত্ব—এমন ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের ভিড়ে লেখকের আত্ম-জিজ্ঞাসাই যেন হয়ে উঠেছে ‘এ জীবন লইয়া কী করিব’ এর কণ্ঠস্বর। আর এই লেখালিখির পথের বিভিন্ন বাঁকে বিশ্বায়নের একটা দীর্ঘ ছায়া তিনি দেখতে পান। সেই তাড়না থেকেই লিখেন, ❝পিকাসো যেমন বলেছিলেন শিল্প হচ্ছে একটা মিথ্যা, যা সত্যকে বুঝতে সাহায্য করে। আমি অক্ষর দিয়ে একটা মিথ্যা জীবন রচনা করতে করতে আমার এই সত্যিকার জীবনটাকে বুঝবার চেষ্টা করি, বিশ্বায়নের যে চাপ সেটাকেও মোকাবিলা করার চেষ্টা করি। চ্যাপলিনের কথাটা আমার পছন্দের। তিনি বলেছিলেন শিল্প হচ্ছে 'আ লাভ লেটার টু দ্য ওয়ার্ল্ড, ওয়েল রিটেন।' শিল্প হচ্ছে পৃথিবীর কাছে লেখা একটা প্রেমপত্র কিন্তু সুলিখিত।
লেখালিখির জগতে পা দেয়ার আগেই শাহাদুজ্জামান একটা দীর্ঘ সময় পার করেছিলেন প্রস্তুতিপর্বে। সেই পর্বে তার সাক্ষাৎ হয়েছিলো আশ্চর্য সব মানুষের সাথে।আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,শহীদুল জহির, তারেক মাসুদ।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে বন্ধুত্ব আর তার সাহিত্য নিয়ে তার টুকরো টুকরো ভাবনার কোলাজ নিয়েই আরেকটা বক্তৃতার আয়োজন। সেখানে একে একে ধরা পড়ে তাদের পরিচয়পর্ব,আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অসুস্থতা, ৩০০ বছর বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, পা হারানোর পর ক্রাচে ভর দিয়ে জোরে জোরে হাঁটার প্র্যাকটিস,বিয়ের অনুষ্ঠানে স্টাফ করা পাখি উপহার দেয়ার গল্প,অসম্পূর্ণ উপন্যাসের রোডম্যাপ আর খোয়াবনামার ইতিবৃত্ত। খুব দরদী ভঙ্গিতে আসে ইলিয়াসের ‘কান্না’গল্পটা নিয়ে আলোচনাও। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি, এই পুরো বক্তৃতা একটুও বোর করে না।
‘শহীদুল জহিরের দিকে দেখি’ বক্তৃতাটা পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে জহিরের লেখাকে ভেঙে ভেঙে বিশ্লেষণের ওপর। প্যারেন্থেসিস স্টাইলে জহির ছোট ছোট বাক্য জুড়ে দীর্ঘ বাক্য লিখে নিজের লেখার একটা নিজস্ব ভঙ্গি দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটা লেখা হয়েছিলো সম্পূর্ণ এক বাক্যে। বাক্যের শেষেও নেই কোনো দাঁড়ি। যেন মহল্লার মানুষের রিপিটেটিভ জীবনধারাকে জহির আটকে দিয়েছিলেন একটা কমায়। এই কমা নিয়েও একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে বক্তৃতার ফুল শার্টের আড়ালে।জাক্সটাপোজিশন,ম্যাজিক রিয়েলিজম, কালেকটিভ থিংকিং কীভাবে জহিরের লেখায় ফিরে ফিরে আসছে তা নিয়ে শাহাদুজ্জামান বলেছেন বাংলার প্রফেসরের মতো। কিন্তু আকর্ষণীয়ভাবে... আর আছে শহীদুল জহিরের ভেতর গোটানো স্বভাব। ভিড় এড়িয়ে কীভাবে নিভৃতে একাকী নেকড়ের মতো জহির একটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন সেই সফরনামা বিস্ময়ের।
শিল্প ভাবনার আরেকটা বক্তৃতা এস এম সুলতানকে নিয়ে। তারেক মাসুদের আদমসুরাতের পর সুলতানের সুইং নিয়ে এমন লেখা অনেক হয়েছে। তবে সুলতানের কাজ আন্তর্জাতিক মানের অথচ সুলতান বিউপনিবেশায়নের মতো পায়াভারী প্রবণতা নিজের জীবনাচরণে,কাজে চর্চা করে গেছেন সেই আলাপটা জরুরি। ‘ডিজিটাল মানব’ শিরোনামের বক্তৃতাটার মূল বক্তব্য আমাদের অপরিচিত নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার পারফর্মেটিভ ছায়াজীবনে আমরা নিজেদের কীভাবে হারিয়ে ফেলছি,কীভাবে কমে যাচ্ছে আমাদের অ্যাটেনশন স্প্যান সেই দাসত্ব নিয়েই একটা অ্যাংশাস জেনারেশনের কথা এনেছেন শাহাদুজ্জামান।
আমাদের দেশে চিকিৎসা আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আন্তজার্তিক পরিসরে অ্যাকাডেমিশিয়ানের কাজ করছেন,তার মধ্যে শাহাদুজ্জামান অন্যতম। দেশের চিকিৎসা আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উপনিবেশায়নের প্রভাব নিয়ে দেয়া বক্তৃতাটা জনসাধারণের জন্য একটু কমপ্যাক্ট হলেও খুব ইফেক্টিভ একটা আলাপ। এখানে যে আমাদেরও নিজস্ব ট্র্যাডিশন থেকে কন্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে একটা বিকল্প মডেল তৈরি করা সম্ভব তা চোখে আঙুল দিয়ে এখানে শাহাদুজ্জামান দেখিয়ে দিয়েছেন। প্যালিয়াটিভ কেয়ার, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন নিয়ে এর আগেও শাহাদুজ্জামান ‘চিকিৎসা বনাম উপশম’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এখানে তা এসেছে আরো ডালপালা মেলে।
আসলে যেটা হয় যে বিভিন্ন সময় নানারকম প্রশ্ন, নানারকম ভাবনা দিয়ে তাড়িত হই আমরা প্রত্যেকে। তারপর সেই ভাবনা আর প্রশ্নগুলো বহন করে বেড়াই অনেকটা মালবাহী ট্রাকের মতো। ভার বোধ করি। একটা সময় সেই ভারটাকে লাঘব করবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই সব প্রশ্ন আর ভাবনার বোঝাটাকে নামানোর ইচ্ছা হয়। শাহাদুজ্জামান একমাত্র লিখেই এই বোঝাটাকে নামাতে পারেন। কিন্তু সব বোঝা তো সব জায়গায় নামানো যায় না। কোনো বোঝা নামাই গল্পে, কোনোটা উপন্যাসে, কোনোটা প্রবন্ধে, কোনোটা পত্রিকার কলামে। লেখালেখি করা তাই তার কাছে একটা ভারমুক্ত হওয়ার ব্যাপার। লিখেই মনে ভার হয়ে থাকা প্রশ্নগুলোকে, ভাবনাগুলোকে মোকাবিলা করতে পারেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,শিল্প-সাহিত্যে তিন ধরনের কাণ্ড হয়। একটা হচ্ছে কর্মকাণ্ড, দ্বিতীয়টি জ্ঞানকাণ্ড আর তৃতীয়টি রসকাণ্ড। সাহিত্য পত্রিকা করা, সাহিত্য নিয়ে সেমিনার এসবই কর্মকাণ্ডের অংশ। পাশাপাশি সাহিত্য তত্ত্ব তৈরি করা, দার্শনিক চিন্তার দিগন্ত তৈরি করা-এসব জ্ঞানকাণ্ডের কাজ। আর নেহাত সৃজনশীল সাহিত্য কবিতা, উপন্যাস, গল্প ইত্যাদি রসকাণ্ডের ব্যাপার। রসকাণ্ডের কেন্দ্র থেকে বৃত্ত এঁকে জ্ঞানকাণ্ডের পরিধি থেকে বেরিয়ে শাহাদুজ্জামান বক্তৃতার মধ্য দিয়ে কর্মকাণ্ডেও নিয়োজিত থেকেছেন। শিরোনামের মতোই জীবনের সম্পর্কে বিরাট জিজ্ঞাসা নিয়ে শাহাদুজ্জামান ক্রমাগত খুঁচিয়ে গেছেন আমাদের প্রশ্নবিন্দুগুলোকে।