প্লাস্টিকজাত সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের সংস্পর্শে তৈরি হচ্ছে শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। সংশ্লিষ্ট কয়েকশো গবেষণা পর্যালোচনার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়কভিত্তিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনওয়াইইউ ল্যাংগোন হেলথের বিশেষজ্ঞরা এ তথ্য জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই এ পর্যালোচনাভিত্তিক সমীক্ষার ফলাফল নিবন্ধ আকারে দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটিতে গত সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫) বৈশ্বিক প্লাস্টিক দূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনকে সামনে রেখে নিবন্ধটি প্রকাশ করা হয়। এতে উঠে আসে, প্লাস্টিকজাত শিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যে তিন শ্রেণির রাসায়নিক ফ্যাথালেটস, বিসফেনলস ও পিএফএএস গর্ভবতী নারী, গর্ভস্থ ভ্রূণ ও শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলোর কারণে শিশুদের হৃদরোগ, স্থূলতা, ভবিষ্যত বন্ধ্যাত্ব, হাঁপানি, এমনকি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যারও ঝুঁকি বাড়ে।
প্রসঙ্গত, এ তিন উপাদানের মধ্যে ফ্যাথালেটস ব্যবহার হয় প্লাস্টিককে নমনীয় করতে। প্লাস্টিকজাত পণ্যকে মজবুত করতে ব্যবহার করা হয় বিসফেনলস। আর এসব পণ্যকে তাপ ও পানি প্রতিরোধী করতে ব্যবহার হয় পিএফএএস।
খাবারের প্যাকেজিং, প্রসাধনী, কাগজের রসিদসহ নানা সামগ্রী থেকে এসব রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে। পাশাপাশি প্লাস্টিক গরম হলে বা প্রক্রিয়াজাত হলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপার্টিকল তৈরি হয়ে সেগুলো খাদ্যের সঙ্গে শরীরে যায়। এসব উপাদান শরীরে নানা ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে, হরমোনের কার্যক্রম ব্যাহত করে এবং শিশুদের আইকিউ হ্রাস, অটিজম, মনোযোগের ঘাটতি এবং অতিসক্রিয়তা (এডিএইচডি) ইত্যাদি সমস্যার সঙ্গে যুক্ত।
নিবন্ধটির প্রধান লেখক এবং শিশু বিশেষজ্ঞ ড. লিওনার্দো ট্রাসান্ডে বলেন, ‘শিশুরা সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে ও দীর্ঘায়ু হতে চাইলে আমাদের প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।’
ড. লিওনার্দো ট্রাসান্ডের হিসাবে, প্লাস্টিক শিল্পের আর্থিক উপযোগিতা থাকলেও শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এর দূষণ থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিজনিত চিকিৎসা ব্যয় ২৫০ বিলিয়ন (২৫ হাজার কোটি) ডলারের কাছাকাছি।
এ অবস্থায় খাবার সংরক্ষণে গবেষকরা কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা, মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকে পাত্র গরম না করা ও তা ডিশওয়াশার দিয়ে না ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সেবাদাতাদের উদ্দেশে শিশুদের অভিভাবকদের এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা ও নিরাপদ বিকল্প বেছে নিতে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলোয় এ বিষয়ে বাড়তি মনযোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। এসব দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি এবং স্বাস্থ্যবৈষম্যও প্রকট। সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের গ্লোবাল প্লাস্টিকস ট্রিটি আলোচনায় শতাধিক দেশের পক্ষ থেকে এ ধরনের পণ্যে উৎপাদন সীমা আরোপের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরির দাবি জানানো হয়।
গবেষকরা বলছেন, তাদের আপত্তি মূলত প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার নিয়ে। চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এর অপরিহার্য ব্যবহার নিয়ে নয়। প্রিম্যাচিউর শিশুর ভেন্টিলেটর, ফিডিং টিউব, হাঁপানির নেবুলাইজার বা সংক্রমণ রোধী মাস্ক—এসব অপরিহার্য অনেক ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক ব্যবহারের কার্যকর কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।