বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা, তাদের আর্থিক-মানসিক চাপের মূল কারণ পর্যাপ্ত টাকার অভাব। বেতনটা আরেকটু বাড়লে, সব ঋণ শোধ হয়ে গেলে আর সঞ্চয়ের একটা ভালো অভ্যাস গড়ে উঠলেই হয়তো সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অঙ্কে পরিবর্তন এলেও উদ্বেগ সহজে কমে না।
বিশ্বখ্যাত সাময়িকী এনপিজে মেন্টাল হেলথ রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রতিবেদন এ পরিস্থিতির পেছনের কারণ ব্যাখা করেছে। দেখা গেছে, বাস্তবে আয় কতটা বাড়ছে বা কমছে তার চেয়েও মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলে তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থাকে কীভাবে দেখছেন। অর্থাৎ, পকেটের টাকা নয়, বরং অর্থের অভাব নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কাই মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বেশি ক্ষতি করে।
মনোবিজ্ঞান ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং মানসিক চাপ দূর করতে ৩টি মূল অভ্যাসের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন:
টাকা ব্যয়ের ‘কারণ’ বোঝা
আমরা অনেকেই বাজে খরচ এড়াতে কড়া আর্থিক নিয়ম মেনে চলি। কিন্তু অবচেতন মনে নানা চাহিদার কারণে এ নিয়ম ভাঙতে থাকে। আমাদের শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নির্ধারণ করে দেয় আমরা প্রাপ্তবয়সে এসে টাকা নিয়ে কেমন আচরণ করব। শৈশবে চরম অভাব দেখে বড় হওয়া মানুষ বড় হয়েও অহেতুক হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন—যার ফলে তিনি হয় অতিরিক্ত কৃপণ হয়ে পড়েন, নয়তো টাকা পেলেই তা দেদারসে উড়ানো শুরু করেন।
আবার অনেক সময় মানসিক চাপ বা বিষন্নতা কাটাতে মানুষ কেনাকাটা করে যাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল স্পেন্ডিং’। তাই প্রতিটি বড় বা ছোট আর্থিক সিদ্ধান্তের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—‘আমি কি সত্যি এটা নিজের প্রয়োজনে কিনছি, নাকি অন্যকে ইমপ্রেস করতে বা সাময়িক মানসিক স্বস্তি পেতে খরচ করছি?’ নিজের আচরণ ও অতীতের আর্থিক অভ্যাসের দুর্বল দিকগুলো চিনতে পারাটাই সঠিক সিদ্ধান্তের প্রথম পদক্ষেপ।
প্রয়োজন ও ইচ্ছার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা
সুখী জীবনের জন্য ‘প্রয়োজন’ ও ‘দীর্ঘমেয়াদি ইচ্ছা’র মধ্যে সমতা রাখা জরুরি। দৈনন্দিন পুষ্টিকর খাবার, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়—আমাদের মূল প্রয়োজন। অন্যদিকে একটি নিজস্ব বাড়ির মালিক হওয়া, ব্যবসা শুরু করা বা অবসর জীবনের প্রস্তুতি হলো আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ ইচ্ছা।
অনেক সময় অন্যের জীবনযাত্রা দেখে সামাজিক প্রভাবে পড়ে বা ‘স্ট্যাটাস’ ধরে রাখতে গিয়ে মানুষ নিজের ভবিষ্যতের সঞ্চয় বা জরুরি তহবিল নষ্ট করে ফেলে। অথচ অন্য আরেকজনের আর্থিক চাহিদা ও মানসিকতা আপনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করে নিজের অগ্রাধিকারগুলোকে আর্থিক সিদ্ধান্তের ফিল্টার হিসেবে ব্যবহার করলে অনাবশ্যক চাপ থেকে মুক্তি মেলে।
অর্থের বাইরে প্রকৃত সম্পদের পরিধি বাড়ান
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মোট জমা টাকা দিয়ে নিজের আর্থিক সাফল্য বা সমৃদ্ধি মাপার মানসিকতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। বাস্তব জীবনে সম্পদ শব্দটি অনেক ব্যাপক। আপনার শারীরিক সুস্থতা, মূল্যবান সময়, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং জ্ঞান—এগুলো সবই আপনার প্রকৃত সম্পদের অংশ, যা কেবল টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
টাকা দিয়ে একজন নামি জিম ট্রেনারের ফি দেয়া যায়, কিন্তু স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কষ্ট করে কসরত আপনাকেই করতে হবে। টাকা আপনার লক্ষ্য পূরণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম বা পথ মাত্র, কিন্তু তা নিজে থেকে চূড়ান্ত সুখ এনে দিতে পারে না। টাকাকে জীবনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক না বানিয়ে একে একটি সহায়ক সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখলে অর্থ সম্পর্কিত সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
আইজি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট অবলম্বনে