পূর্বপুরুষদের চেয়ে আধুনিক মা-বাবারা কেন বেশি পরিশ্রান্ত?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আগে বড় যৌথ পরিবারে শিশুর দায়িত্ব ভাগ হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে শহুরে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে মা-বাবাকে একাই সব সামলাতে হয়। একদিকে অফিসের কাজ, অন্যদিকে শিশুর যত্ন— ‘ডাবল শিফট’ ডিউটিই আধুনিক মা-বাবাদের পরিশ্রান্ত করছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ আড্ডা সবখানেই নতুন মা-বাবার চোখেমুখে ‘বোন-ক্রাশিং’ বা হাড়ভাঙা ক্লান্তির ছাপ নিয়ে আলোচনা চলে। বর্তমান সময়ে সন্তান লালন-পালন মানেই এক দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তিকর কাজ। কিন্তু বিবর্তনীয় বিজ্ঞান বলছে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা সন্তান প্রতিপালনে এতটা পরিশ্রান্ত বোধ করতেন না।

জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রায় ৪০ হাজার বাবা-মায়ের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান হওয়ার পর মা-বাবারা গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় বিছানায় কাটান, যা একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য যথেষ্ট। অথচ অধিকাংশ মা-বাবা জানিয়েছেন, তারা ক্লান্ত এবং তাদের ঘুমের মান খুবই নিম্ন। এর বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় কারণ উঠে এসেছে এ গবেষণায়।

শিল্প বিপ্লবের আগে ‘একনাগাড়ে গভীর ঘুম’ বা কনসলিডেটেড স্লিপের ধারণা আজকের মতো ছিল না। পূর্বপুরুষদের ৯টা-৫টা অফিসের ঝামেলা ছিল না, গাড়ি চালানো বা ভারী মেশিন চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল না। ফলে রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে গেলেও তাদের দৈনন্দিন কাজে বড় কোনো ব্যাঘাত ঘটত না।

আমাদের পূর্বপুরুষদের ক্লান্তি কম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সামাজিক সহায়তা বা ‘অ্যালোপ্যারেন্টিং’। নৃবিজ্ঞানী সারা হার্ডির মতে, মানুষ কখনোই একা সন্তান লালন করার জন্য বিবর্তিত হয়নি। একসময় দাদি, নানি বা চাচি-ফুপুরা মিলে শিশুকে সামলাতেন। মধ্য আফ্রিকার ‘এফে’ গোষ্ঠীতে দেখা গেছে, দিনের ৬০ শতাংশ সময়ই শিশু মায়ের বদলে অন্য আত্মীয়দের কোলে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আগে বড় যৌথ পরিবারে শিশুর দায়িত্ব ভাগ হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে শহুরে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে মা-বাবাকে একাই সব সামলাতে হয়। একদিকে অফিসের কাজ, অন্যদিকে শিশুর যত্ন— ‘ডাবল শিফট’ ডিউটিই আধুনিক মা-বাবাদের পরিশ্রান্ত করছে।

এছাড়া, বর্তমানে শিশুদের আলাদা ঘর বা বিছানায় শোয়ানোর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে শিশুকে খাওয়ানো বা সামলানোর সময় বাবা-মাকে পূর্ণ সজাগ থাকাতে হয়। এছাড়া অতিরিক্ত সচেতনতার কারণেও তারা জেগে থাকেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অতি-সতর্কতা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে নিয়ে যায়। ফলে শিশু ঘুমিয়ে পড়ার পরও মা-বাবার চট করে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, পূর্ব আধুনিক যুগের মায়েরা শিশুর পাশেই ঘুমাতেন (যাকে গবেষকেরা ‘ব্রেস্ট-স্লিপিং’ বলেন)। এতে শিশুর সামান্য নড়াচড়াতেও তারা আধো-জাগরণ অবস্থায় বুকের দুধ খাইয়ে আবার সঙ্গে সঙ্গেই অবচেতন ঘুমে ফিরে যেতে পারতেন। ফলে তাদের মস্তিষ্ক পূর্ণ বিশ্রামের সুযোগ পেত।

বিজ্ঞানীদের মতে, মানবজাতি বিবর্তিতই হয়েছে সংকটের সময় কম ঘুমে টিকে থাকার জন্য। সন্তান লালন-পালন এমনই এক ‘মিশন-ক্রিটিক্যাল’ সময়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন কারণ তাদের জীবনযাত্রা ছিল ধীরগতির। কিন্তু আধুনিক মা-বাবার অধিকাংশের অফিসে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়, জ্যামে বসে থাকতে হয় এবং যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে হয়।

আরও