ইটিং ডিজঅর্ডার: খাবার যখন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়

ইটিং ডিজঅর্ডার মূলত এমন এক ধরনের মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষের খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ে অস্বাভাবিক ও নেতিবাচক চিন্তাভাবনা তৈরি হয়। এটি কেবল অতিরিক্ত খাওয়া বা কম খাওয়ার বিষয় নয়; বরং এর থেকে জন্ম নেয় নিজের শরীরের প্রতি তীব্র অসন্তোষ

আহার মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। কিন্তু যখন এ আহার বা খাদ্যাভ্যাস দৈনিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে, তখন তা আর শারীরিক সমস্যা থাকে না; রূপ নেয় জটিল মানসিক ব্যাধিতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’। বর্তমানের ডায়েট-সচেতন সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘পারফেক্ট বডি’ ইমেজের যুগে এ সমস্যা বিশ্বজুড়ে প্রকট হচ্ছে।

ইটিং ডিজঅর্ডার কী?

ইটিং ডিজঅর্ডার মূলত এমন এক ধরনের মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন মানুষের খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ে অস্বাভাবিক ও নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা তৈরি হয়। এটি কেবল অতিরিক্ত খাওয়া বা কম খাওয়ার বিষয় নয়; বরং এর থেকে জন্ম নেয় নিজের শরীরের প্রতি তীব্র অসন্তোষ। এটি যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে, তবে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি।

প্রধান ধরন ও লক্ষণ

ইটিং ডিজঅর্ডারের বেশ কিছু ধরন থাকলেও তিনটি সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:

  • অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা: এতে আক্রান্তরা নিজেদের ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র আতঙ্কে থাকেন। তারা খাবার গ্রহণ প্রায় বন্ধ করে দেন এবং শরীর কঙ্কালসার হয়ে গেলেও নিজেদের ‘মোটা’ মনে করেন।
  • বুলিমিয়া নার্ভোসা: এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা একসাথে প্রচুর পরিমাণে খাবার খেয়ে ফেলেন এবং পরে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে জোর করে বমি করে বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে সেই খাবার শরীর থেকে বের করার চেষ্টা করেন।
  • বিঞ্জ ইটিং ডিজঅর্ডার: এতে ব্যক্তি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্বল্প সময়ে প্রচুর খাবার খান। বুলিমিয়ার মতো তারা খাবার বের করে দেন না, ফলে তারা দ্রুত স্থূল হয়ে পড়েন এবং তীব্র মানসিক হতাশায় ভোগেন।

কেন হয় এ সমস্যা?

ইটিং ডিজঅর্ডারের কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। সাধারণত কয়েকটি বিষয়ের সমন্বয়ে এটি তৈরি হয় —

  • আত্মবিশ্বাসের অভাব, পারফেকশনিজম (সবকিছু নিখুঁত করার প্রবণতা) ও বিষণ্ণতা
  • মিডিয়ায় জিরো ফিগার বা রুগ্ন শরীরকে সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করা
  • মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক উপাদানের ভারসাম্যহীনতা বা বংশগতি।
  • অতীতে শারীরিক বা মানসিক কোনো আঘাত বা হেনস্থার শিকার হওয়া।

প্রতিকার ও উত্তরণের পথ

ইটিং ডিজঅর্ডার থেকে মুক্তি পাওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও অসম্ভব নয়। এর প্রতিকারে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ —

  • শুরুতেই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।
  • সঠিক ওজন ফিরে পেতে এবং খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে একজন পুষ্টিবিদের গাইডলাইন প্রয়োজন।
  • এ লড়াইয়ে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর সমালোচনা না করে তাকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করা যে তিনি একা নন।
  • আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের খুঁত না খুঁজে নিজের শরীরকে ভালোবাসতে শেখা। সুস্থতা মানে কেবল চিকন হওয়া নয়, বরং কর্মক্ষম থাকা।

আরও