একা খাওয়ার অভ্যাস কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? যা বলছে গবেষণা

সকালের নাশতা হোক বা রাতের খাবার—ব্যস্ততার কারণে অনেকেরই খেতে বসতে হয় একা। কেউ আবার নিজের মতো করে খেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ওই সময়টুকুতে সামনে খাবার, হাতে মোবাইল; স্ক্রিনে চোখ রাখতে রাখতেই খাবারের সময়টা কেটে যায়। আবার একই বাড়িতে থেকেও পরিবারের সদস্যদের খাবারের সময় আলাদা হতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, বদলে যাওয়া কাজের ধরন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভ্যাসের প্রভাবে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগ দিন দিন কমছে। কিন্তু খাবারের সময় পাশে কেউ থাকা বা না থাকার বিষয়টি কি শুধু একাকিত্বের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত? গবেষণা বলছে, নিয়মিত একা খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্পর্ক এমনকি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, একা খেলেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। বরং অন্যদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করার অভ্যাস মানুষের ভালো থাকা ও সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে।

একা খাওয়া ও বিষণ্নতার সম্পর্ক

একসঙ্গে বসে খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। এর অনেকগুলোতেই দেখা গেছে, খাবারের সময় অন্যদের সঙ্গ পাওয়া মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

চীনের এক গবেষণায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৯ হাজারের বেশি নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, খাবারের সময় একজনের সঙ্গে কতজন বসছেন, তার সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থা কিংবা তিনি একা থাকেন কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়ার পরও এ সম্পর্ক দেখা গেছে।

জাপানের আরেক গবেষণায়ও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতে থেকেও যারা নিয়মিত একা খেতেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা দেয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।

অবশ্য এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এসব গবেষণা একা খাওয়া ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছে; একা খাওয়াই সরাসরি বিষণ্নতার কারণ—এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

অন্যদের সঙ্গে খেলে বাড়ে মানসিক স্বস্তি

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের এক বিশ্লেষণেও একসঙ্গে খাওয়া ও ভালো থাকার অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় দেড় লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, যারা অন্যদের সঙ্গে বেশি সময় একসঙ্গে খাবার খান, তাদের মানসিক স্বস্তি ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রাও তুলনামূলক বেশি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জান-এমানুয়েল দ্য নেভের মতে, একসঙ্গে খাবার খাওয়া মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সামাজিক সংযোগ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

খাবারও কি তখন বেশি ভালো লাগে?

গবেষণায় এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে, অন্য কারো সঙ্গে খাওয়ার সময় খাবারের অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিকা বুথবির একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য একজনের সঙ্গে বসে চকলেট খাওয়ার সময় অংশগ্রহণকারীরা সেটিকে তুলনামূলক বেশি সুস্বাদু বলে মনে করেছেন।

এর পেছনে শুধু খাবারের স্বাদ নয়, সামাজিক পরিবেশও ভূমিকা রাখতে পারে। কারও সঙ্গে আনন্দের একটি অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করলে সেই মুহূর্তটি আরো উপভোগ্য মনে হতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবিক নৃবিজ্ঞানী রবিন ডানবারও তার গবেষণায় খাবার ও সামাজিক বন্ধনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। খাবার খাওয়ার সময় শরীরে এন্ডরফিন নামের এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হতে পারে, যা ভালো লাগা বা আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর এটি অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অনুভূতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে?

বিষয়টি শুধু মন ভালো থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একা খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়েও গবেষণা চলছে।

গত বছর জাপানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত একা খাবার খান, তাদের মস্তিষ্কের স্মৃতি ও অন্যান্য জ্ঞানীয় ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অংশের আয়তন তুলনামূলক কম হতে পারে।

গবেষকেরা অবশ্য এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। যারা একা খান, তাদের খাদ্যতালিকা তুলনামূলক কম পুষ্টিকর হতে পারে। তবে শুধু খাবারের ধরন দিয়ে সব পার্থক্যের ব্যাখ্যা করা যায়নি। সামাজিক সংযোগের ঘাটতিও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একসঙ্গে খাওয়ার সময়ের কথোপকথনও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। গল্প, আলোচনা কিংবা সাধারণ আলাপচারিতাও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। অন্যদিকে, সামাজিক সমর্থন ও অন্যদের সঙ্গ মানসিক চাপ সামলাতেও সহায়ক হতে পারে।

তাহলে কি সব সময় একসঙ্গেই খেতে হবে?

বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন সব বেলা পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজ, পড়াশোনা কিংবা ভিন্ন সময়সূচির কারণে অনেক সময় একা খেতেই হয়। তাই একা খাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কারণ নেই।

তবে সুযোগ থাকলে খাবারের সময়টুকুকে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সপ্তাহে এক দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে রাতের খাবার, ছুটির দিনে বন্ধুর সঙ্গে দুপুরের খাবার কিংবা অফিসে সহকর্মীর সঙ্গে নাশতা—ছোট ছোট এসব অভ্যাসও দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা সামাজিক সংযোগ তৈরি করতে পারে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও