আপনার দাম্পত্য সম্পর্কে কী ভরসার অভাব আছে? জানুন লক্ষণ ও উত্তরণের উপায়

যখন কারো ভেতর দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে তার কঠিন সময়ে সঙ্গী বিদ্রূপ না করে বরং সহানুভূতি দেখাবে, তখনই সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। ভিন্নমতের প্রতি সঙ্গীর সহানুভূতি ও সমর্থন দেখানোর এ প্রবণতাই মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা বা পাস্পরিক ভরসা তৈরি করে। তবে নিরাপদ সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে সেখানে মতবিরোধ হবে না

দাম্পত্য সম্পর্কে একে অপরের প্রতি ভয়, এড়িয়ে চলার প্রবণতা বা নিজের কথা চেপে রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সম্পর্কের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো দম্পতিকে প্রতিটি কথা বলার আগে ‘ডিমের খোসার ওপর দিয়ে হাঁটার’ মতো সতর্ক থাকতে হয়, তবে বুঝতে হবে সে সম্পর্কে ভরসার অভাব বা ‘মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার’ সংকট রয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা কী?

মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা সুস্থ সম্পর্কের অপরিহার্য শর্ত। কোনো কিছু বললেই অপর পক্ষ বিস্ফোরিত হবে—এ আতঙ্ক সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দেয়। যখন কোনো দম্পতির কাছে কোনো সাধারণ আলোচনা ‘মাইনফিল্ড’ পার হওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়, তখনই সম্পর্কের ভাঙন শুরু হয়।

নিউইয়র্কভিত্তিক থেরাপিস্ট মার্টি বাবিটসের মতে, ‘আবেগীয় নিরাপত্তা’ এমন এক অনুভূতি যেখানে কোনো ধরনের প্রত্যাখ্যানের ভয় ছাড়াই নিজের দুর্বলতা বা অনুভূতি সঙ্গীর সামনে প্রকাশ করা যায়। এটি এক ধরনের ‘স্বস্তি ও স্বকীয়তা’। নিরাপদ বোধ করলে মানুষ তার আবেগ নিয়ে স্বচ্ছ হতে পারে, যা থেকে গভীর মানসিক সংযোগের জন্ম হয়।

এ নিরাপত্তার মূল উপাদান ‘প্রিডিক্টাবিলিটি’ বা সঙ্গীর আচরণ সম্পর্কে ইতিবাচক পূর্বানুমান। যখন কারো ভেতর দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, তার কঠিন সময়ে সঙ্গী বিদ্রূপ না করে বরং সহানুভূতি দেখাবে, তখনই সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। ভিন্নমতের প্রতি সঙ্গীর সহানুভূতি ও সমর্থন দেখানোর এ প্রবণতাই মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা বা পাস্পরিক ভরসা তৈরি করে। তবে নিরাপদ সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে সেখানে মতবিরোধ হবে না।

যাদের সম্পর্ক আবেগগতভাবে নিরাপদ, তাদের মধ্যেও মতবিরোধ হয়। তবে পার্থক্যটি হলো, তারা পরস্পরকে দোষারোপ করার বদলে একটি উন্মুক্ত ও কৌতূহলী মনোভাব নিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেন। তারা দ্বন্দ্ব চলমান অবস্থায়ও পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে কথা বলেন। থেরাপিস্ট জর্জ ফ্যালার মনে করেন, সম্পর্ক কতটা গভীর তা নির্ভর করে ঝগড়ার পর তা ‘মেরামত’ করার ক্ষমতার ওপর। আর সব মেরামতের শুরু হয় আলাপচারিতার মাধ্যমে। এর কোনো সংক্ষিপ্ত পথ বা শর্টকাট নেই।

সংকটের লক্ষণ ও প্রভাব

সম্পর্কে ভরসা বা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার অভাব থাকলে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  • নেতিবাচক প্রত্যাশা: যেকোনো আলোচনায় সঙ্গীর রাগ বা দূরত্বের ভয় কাজ করা।
  • অসততা ও গোপনীয়তা: পরিণতির ভয়ে নিজের অনুভূতি গোপন করা, যা পরবর্তী সময়ে বিষাক্ত চক্র তৈরি করে।
  • শারীরবৃত্তীয় প্রভাব: মনস্তাত্ত্বিক চাপ স্নায়ুতন্ত্রকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে নিয়ে যায়, যা সুস্থ যোগাযোগকে অসম্ভব করে তোলে।
  • বিচ্ছিন্নতা: যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া এবং মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মাদক বা অন্য নেতিবাচক অভ্যাসে ঝুঁকে পড়া।

উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলেছেন:

  • স্বীকৃতি: সমস্যার কথা মুখ ফুটে স্বীকার করা পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। অবিশ্বাসের জায়গাগুলো চিহ্নিত করলে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।
  • যোগাযোগের ভাষা: আক্রমণাত্মক বা সমালোচনামূলক ভাষা পরিহার করে অহিংস যোগাযোগের চর্চা করা।
  • পেশাদার সহায়তা: দাম্পত্য কাউন্সিলিং এক্ষেত্রে মাইলফলক হতে পারে। একজন নিরপেক্ষ থেরাপিস্ট আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও কথা বলার সঠিক কৌশল শিখতে সাহায্য করেন।
  • বাস্তবসম্মত লক্ষ্য: মনে রাখতে হবে, সবসময় শতভাগ নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব না-ও হতে পারে। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ‘যথেষ্ট নিরাপদ’ পরিবেশ তৈরি করা।

    সিএনএন অবলম্বনে

আরও