মাত্র ২০ মিনিট প্রকৃতির মাঝে থাকলেই মিলতে পারে বড় স্বাস্থ্য উপকার

এমনকি কম্পিউটারের পর্দায় বন বা সবুজ প্রকৃতির ছবি দেখলেও মস্তিষ্কে প্রশান্তির পরিবর্তন শুরু হতে পারে। জানালার বাইরে সবুজ গাছপালার দিকে তাকিয়েও মানসিক চাপ কমানো সম্ভব।

পার্কে হাঁটতে গিয়ে কিংবা গাছপালার ভেতর কিছু সময় কাটানোর পর যদি নিজেকে বেশি শান্ত মনে হয়, তবে সেটি কেবল অনুভূতি নয়; এর পেছনে রয়েছে জৈবিক কারণ। গবেষকরা বলছেন, প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটালে শরীরে বাস্তব পরিবর্তন ঘটে। এতে কমতে পারে মানসিক চাপের হরমোন, নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে রক্তচাপ, এমনকি অন্ত্রের স্বাস্থ্যও ভালো হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপকার পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জঙ্গলে থাকার প্রয়োজন নেই। মাত্র ২০ মিনিট প্রকৃতির মধ্যে থাকলেই শরীরে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। তাই সপ্তাহে কয়েকদিন দুপুরের বিরতিতে পার্কে হাঁটা কিংবা গাছপালার পাশে বসে খাবার খেলেও শরীর ও মনের উপকার হতে পারে।

গবেষকদের ভাষায়, প্রকৃতির সংস্পর্শে গেলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাড়া দেয়। সবুজ গাছ দেখা, পাখির ডাক শোনা কিংবা পাতার মৃদু শব্দ শরীরকে অজান্তেই শান্ত করতে শুরু করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক অধ্যাপক ব্যারোনেস ক্যাথি উইলিস বলেন, প্রকৃতির মধ্যে থাকলে শরীরে এমন পরিবর্তন দেখা যায় যা রক্তচাপ কমায়, হৃদস্পন্দনের গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরকে স্বাভাবিকভাবে শান্ত করে তোলে।

গবেষকরা বলছেন, প্রকৃতির প্রভাব শুধু মনের ওপর নয়, শরীরের হরমোন ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। বাইরে সময় কাটালে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা কমতে শুরু করে। সাধারণত চাপ বা উদ্বেগের সময় এসব হরমোন বেড়ে যায়।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিং কুও বলেন, প্রকৃতি শরীরের যে অংশকে শান্ত করা দরকার সেটিকে শান্ত করে এবং যে অংশকে শক্তিশালী করা দরকার সেটিকে শক্তিশালী করে। তার মতে, প্রকৃতির মধ্যে তিন দিনের একটি ছুটিও মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি এক মাস পরও ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি থাকতে পারে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গাছ ও মাটির গন্ধে বিভিন্ন জৈব যৌগ থাকে, যা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা পাইন গাছের কথা বলেছেন। তাদের মতে, পাইন বনের গন্ধ মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষকে শান্ত অনুভব করাতে পারে এবং সেই প্রভাব প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

এমনকি ছোট শিশুরাও প্রকৃতির গন্ধে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মৃতিশক্তি তৈরি হওয়ার আগের বয়সী শিশুরাও ‘লিমোনিন’ নামের একটি প্রশান্তিদায়ক গন্ধ পেলে শান্ত হয়ে যায়।

অধ্যাপক মিং কুও বলেন, কিছু ব্যাকটেরিয়া মানুষের মানসিক অবস্থাও ভালো করতে পারে। এছাড়া উদ্ভিদ থেকে নির্গত ‘ফাইটোনসাইড’ নামের রাসায়নিক উপাদান জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও সাহায্য করতে পারে। সংক্রমণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস ভ্যান টুলেকেন বলেন, প্রকৃতি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে। তিনি সন্তানদের মাটিতে খেলতে দেন, যাতে শরীর স্বাভাবিক পরিবেশের জীবাণুর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

তবে সবাই যে নিয়মিত বন বা পার্কে যেতে পারবেন, তা নয়। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, ঘরেও ছোট ছোট উপায়ে প্রকৃতির ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া সম্ভব। ক্যাথি উইলিসের মতে, ঘরে সাদা বা হলুদ গোলাপ রাখলেও মস্তিষ্কে প্রশান্তিদায়ক প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে পাইনজাতীয় সুগন্ধযুক্ত তেল ব্যবহার করলেও মানুষ শান্ত অনুভব করতে পারে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, এমনকি কম্পিউটারের পর্দায় বন বা সবুজ প্রকৃতির ছবি দেখলেও মস্তিষ্কে প্রশান্তির পরিবর্তন শুরু হতে পারে। জানালার বাইরে সবুজ গাছপালার দিকে তাকিয়েও মানসিক চাপ কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার প্রতিটি ছোট সুযোগই শরীর ও মনের জন্য উপকারী হতে পারে।

আরও