এক সময় প্রেমের সম্পর্কের শুরুতে অর্থকড়ির আলাপ ছিল চরম ‘ট্যাবু’ বা নিষিদ্ধ বিষয়। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়ালদের কাছে সম্পর্কের গভীরতা মাপার মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে। আবেগ বা রোমান্সের চেয়েও তারা এখন সঙ্গীর ‘আর্থিক সংগতি’ ও অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিবর্তনীয় এ পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা সম্পর্কের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায়, এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কাপল’ হওয়ার আগেই পরস্পরের আয়, বিনিয়োগ ও ব্যয় করার প্রবণতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। আটলান্টা প্রদেশের মিলেনিয়াল প্রজন্মের ওকেহে-এর মতে, টাকা জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যেটি প্রতিটি আলাপেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার কাছে আর্থিক স্বচ্ছতা কেবল বিশ্বাসই বাড়ায় না, বরং একে অপরের প্রতি আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দেয়।
আয় বনাম ব্যবস্থাপনা: গুরুত্ব পাচ্ছে কোনটি?
সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চ আয় থাকতেই হবে—এমন ধারণা থেকে তরুণরা এখন বেরিয়ে আসছে। তাদের মতে, সঙ্গীর কত টাকা আছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে টাকা কীভাবে খরচ বা সঞ্চয় করে। উদাহরণ হিসেবে ওকেহে-এর কথাই ধরা যাক। তার বার্ষিক আয় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। বিপরীতে তার সঙ্গী বারহানে বছরে ৪০ হাজার ডলার আয় করেন। দুজনের আয়ের এ বিস্তর ফারাক থাকলেও তাদের কাছে বড় বিষয় হলো লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সমন্বয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কাপল হওয়ার আগেই তারা প্রি-নাপশিয়াল এগ্রিমেন্ট (বিয়ের আগের চুক্তি), বিনিয়োগ, এমনকি চিকিৎসা সংক্রান্ত ঋণ নিয়েও খোলামেলা কথা বলে নিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া ‘ওকেএক্সে’-এর একটি বিশেষ জরিপ বলছে, তিন-চতুর্থাংশ মিলেনিয়াল ও জেন-জি মনে করেন, সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর মধ্যে ব্যক্তিগত অর্থায়ন বা ‘পার্সোনাল ফিন্যান্স’ সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গুণ। আরো আকর্ষণীয় বিষয়, ডিজিটাল সম্পদের প্রতি আগ্রহ। ৬৬ শতাংশ মিলেনিয়াল ও ৬৫ শতাংশ জেন-জি মনে করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ডিজিটাল সম্পদ সম্পর্কে ধারণা থাকলে সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এমনকি অর্ধেকেরও বেশি তরুণ এমন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যা মূলত ‘ওয়ালেট কম্প্যাটিবিলিটি’ বা আর্থিক সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে ম্যাচিং করবে।
বিচ্ছেদ ঠেকাতে আর্থিক স্বচ্ছতা
লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক সার্টিফাইড ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানার উচেচি কালু মনে করেন, সম্পর্কের শুরুতেই অর্থ নিয়ে কথা বলা জরুরি। তিনি বলেন, সম্পর্কের অন্যতম প্রধান মানসিক চাপের কারণ হলো টাকা। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণও এটি।
তার মতে, আজকের স্বচ্ছতা আগামীকালের বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, মানুষের আর্থিক অবস্থা সারাজীবন এক থাকে না, তাই পরিবর্তনের মানসিকতা থাকাও সমান জরুরি।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের এ যুগে তরুণরা এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী। এক সময় সম্পর্কের শুরুতে অর্থের আলাপকে ‘স্বার্থপরতা’ মনে করা হলেও, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি ‘দায়িত্বশীলতা’। প্রি-নাপ বা ঋণের বোঝা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এখন আর লজ্জা নয়, বরং একটি টেকসই ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের প্রথম ধাপ।
রয়টার্স অবলম্বনে