মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এক সময় চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার ছিল অত্যন্ত দুর্লভ। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন বনে-জঙ্গলে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন, তখন মধু বা মিষ্টি ফলের মতো উচ্চ শক্তিসম্পন্ন খাবার ছিল তাদের টিকে থাকার প্রধান রসদ। কিন্তু আজকের যুগে সেই চিনিই হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিক মানুষের স্বাস্থ্যের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
স্বাদ যখন আসক্তি
ডায়েটিশিয়ান ডন মেনিঙের মতে, চিনি যখনই আমাদের জিভ স্পর্শ করে, মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে সংকেত পাঠায় যে এটি শক্তির একটি দ্রুত উৎস। এর ফলে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক ধরণের ভালো লাগার হরমোন নিঃসৃত হয়। মজার বিষয় হলো, মিষ্টির স্বাদ পাওয়ার ক্ষমতা সবার এক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মিষ্টির প্রতি সংবেদনশীলতার প্রায় ৩০ শতাংশ জিনগত কারণের ওপর নির্ভর করে।
শরীরের ভেতরে চিনির দুই রূপ: গ্লুকোজ বনাম ফ্রুক্টোজ
আমরা সাধারণত যে চিনি বা শর্করা খাই, তা মূলত দুই ধরনের প্রভাব ফেলে:
- গ্লুকোজ: এটি রক্তে মেশার পর প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন নির্গত হয়। গ্লুকোজ আমাদের পেশি বা লিভারে শক্তি হিসেবে জমা থাকে। তবে অতিরিক্ত গ্লুকোজ চর্বি হিসেবে শরীরে জমে যায়।
- ফ্রুক্টোজ: এটি সাধারণত ফলমূল বা জুসে পাওয়া যায়। ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারে চলে যায়। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে লিভারে চর্বি জমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
লন্ডনের কিংস কলেজ লন্ডনের পুষ্টিবিজ্ঞানী অধ্যাপক সারাহ বেরি জানান, রক্তে অতিরিক্ত চিনি রক্তনালীতে চর্বি বা ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে।
অনেকেই মনে করেন চিনি খেলে শিশুদের চঞ্চলতা বাড়ে, যাকে বলা হয় 'সুগার রাশ'। তবে গবেষণায় দেখা গেছে এটি অনেকটা মানসিক ধারণা বা প্লাসিবো ইফেক্ট। বরং চিনি খাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে শরীরে ক্লান্তি বা অবসাদ আসতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রক্তে চিনির মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে আবার কমে গেলে আমাদের প্রচণ্ড খিদে পায়, একে বলা হয় সুগার ডিপ। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তে চিনির মাত্রা দ্রুত কমে যায়, তারা সারাদিনে গড়ে ৩২০ ক্যালরি বেশি খাবার গ্রহণ করেন।
কখন, কীভাবে চিনি খাবেন?
পুষ্টিবিদদের মতে, চিনি পুরোপুরি বর্জন করার চেয়ে তা পরিমিত এবং সঠিক সময়ে খাওয়া বেশি জরুরি।
- বিকালের তুলনায় সকালে আমাদের শরীর ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল থাকে, তাই মিষ্টি জাতীয় খাবার সকালে খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
- শুধু চিনি না খেয়ে তা প্রোটিন, ফাইবার বা স্বাস্থ্যকর চর্বির সাথে মিশিয়ে খেলে রক্তে চিনির মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না।
- অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার রক্তে চিনির মাত্রা একদম সমান বা 'ফ্ল্যাটলাইন' রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাওয়ার পর রক্তে চিনির মাত্রা কিছুটা বেড়ে যাওয় একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। যদি তা মাত্রাতিরিক্ত হয় তাহলে এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু।
কৃত্রিম মিষ্টি কি সমাধান?
চিনির বদলে অনেকে কৃত্রিম সুইটেনার ব্যবহার করেন। তবে নতুন কিছু গবেষণা বলছে, কিছু সুইটেনার আমাদের মুখের ও পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি করতে পারে। তাই এটিকেও পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।
গার্ডিয়ান অবলম্বনে