দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও স্থূলতার সম্পর্ক

চার দিনের কর্মসপ্তাহের জোরালো দাবি যুক্তরাজ্যে

গবেষণার প্রধান লেখক অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ডা. প্রদীপা কোরালে-গেদারা। তিনি বলেন, মানসিক চাপ বাড়লে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতাও বেড়ে পায়। পাশাপাশি এমন কাজের পরিবেশে থাকা, যেখানে শারীরিকভাবে শক্তি ব্যয় করার সুযোগ কম, সেটিও প্রভাব ফেলে

দীর্ঘ সময় কাজ করলে স্থূলতা বা ওবেসিটির ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে কাজের সময় কমালে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণার এমন ফলাফল যুক্তরাজ্যে চার দিনের কর্মসপ্তাহের জোরালো করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অন ওবেসিটি-তে উপস্থাপিত ওই গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩৩টি ওইসিডি-ভুক্ত দেশের কর্মপদ্ধতি ও স্থূলতার হার তুলনা করা হয়।

এতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার মতো দেশে যেখানে বার্ষিক কর্মঘণ্টা বেশি, সেখানে স্থূলতার হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও উত্তর ইউরোপের দেশগুলোয় গড়ে শক্তি ও চর্বি গ্রহণের পরিমাণ লাতিন আমেরিকার তুলনায় বেশি।

গবেষণায় বলা হয়, বার্ষিক কর্মঘণ্টা ১ শতাংশ কমলে স্থূলতার হার গড়ে দশমিক ১৬ শতাংশ কমে আসে। গবেষকদের মতে, ব্যায়ামের জন্য সময়ের অভাব এবং কাজজনিত মানসিক চাপ এ দুইটি কারণই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন বেশি সময় কাজ করা মানুষের মধ্যে ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।

গবেষণার প্রধান লেখক অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ডা. প্রদীপা কোরালে-গেদারা। তিনি বলেন, মানসিক চাপ বাড়লে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতাও বেড়ে পায়। পাশাপাশি এমন কাজের পরিবেশে থাকা, যেখানে শারীরিকভাবে শক্তি ব্যয় করার সুযোগ কম, সেটিও প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, ‘যখন মানুষের বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হয়, তখন তাদের জীবনও ভালো হয়। তারা কম চাপ অনুভব করে, পুষ্টিকর খাবারের দিকে মনোযোগ দিতে পারে এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডে বেশি অংশ নিতে পারে।’

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এ গবেষণা সরাসরি কর্মঘণ্টা ও স্থূলতার কার্য-কারণ সম্পর্ক প্রমাণ করে না। বিভিন্ন দেশের আয়ের পার্থক্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এরপরও বিষয়টি যুক্তরাজ্যে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর দাবিকে নতুন করে জোরদার করেছে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০টি কোম্পানি তাদের কর্মীদের জন্য এ কাজের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে সাউথ কেমব্রিজশায়ার ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলে ৪৫টির মধ্যে ৪৩টি আসন জেতা লিবারেল ডেমোক্র্যাট প্রশাসন সব কর্মীদের জন্য চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।

যুক্তরাজ্যে অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যানুযায়ী, কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে দুই লাখেরও বেশি কর্মী চার দিনের কর্মসপ্তাহে স্থানান্তরিত হয়েছেন।

ফোর ডে উইক ফাউন্ডেশনের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার জেমস রিভস বলেন, পূর্ণ বেতনে চারদিনের কর্মসপ্তাহ ব্রিটেনের স্থূলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। কারণ এতে লাখ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ত্যাগ করে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় পাবে।

তিনি আরো বলেন, কীভাবে ছোট কর্মসপ্তাহ আমাদের সমাজের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে তা স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। ৯-৫টা, সপ্তাহে পাঁচদিন এখন ১০০ বছরের পুরনো কর্মপদ্ধতি—এটি হালনাগাদ করার সময় এসেছে।

গত বছর চারদিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে একটি গবেষণা পর্যালোচনা প্রকাশ করেছিলেন ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের মনোবিজ্ঞানী ডা. রিটা ফন্টিনহা। তিনি বলেন, ‘চার দিনের কর্মসপ্তাহ বা কাজের সময় কমলে খাদ্য, ব্যায়াম ও ঘুমের ক্ষেত্রে আরো ভালো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।’

তবে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে চারদিনের কর্মসপ্তাহের ধারণার বিরোধিতা করা হয়েছে। সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এই সরকার পাঁচ দিনের বেতনের বিনিময়ে চারদিনের কর্মসপ্তাহ বাধ্যতামূলক করবে না। তবে এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্টের মাধ্যমে আমরা নমনীয় কাজের অনুরোধ গ্রহণ করা আরো সহজ করছি।’

আরও