ডিপ্লিটেড মাদার সিনড্রোম: মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয়

সমাজ মায়েদের ‘দশভুজা’ বা ‘সুপারহিরো’ রূপে দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু এ অলীক উপাধি বজায় রাখতে গিয়ে আড়ালে তারা শারিরীক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘প্যারেন্টাল বার্নআউট’ বলা হলেও বর্তমানে এটি ‘ডিপ্লিটেড মাদার সিনড্রোম’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে

ঘরভর্তি খেলনা ছড়িয়ে আছে, চুলায় ভাত ফুটছে, আর ওদিকে ছোট সন্তানটি একটানা কেঁদেই চলেছে—এ দৃশ্যপট প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের। আর এর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি, মা। সমাজ তাকে ‘দশভুজা’ বা ‘সুপারহিরো’ রূপে দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু এ অলীক উপাধি বজায় রাখতে গিয়ে আড়ালে মায়েরা শারিরীক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘প্যারেন্টাল বার্নআউট’ বলা হলেও বর্তমানে এটি ‘ডিপ্লিটেড মাদার সিনড্রোম’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে।

এটি আসলে কোনো স্বীকৃত অসুখ নয়, বরং মায়ের বিপর্যস্ত মানসিক ও শারীরিক অবস্থা। ‘ডিপ্লিটেড মাদার সিনড্রোম’-কে খালি হয়ে যাওয়া তেলের কলসির সঙ্গে তুলনা করা যায়। যার তলায় আর এক ফোঁটাও তেল অবশিষ্ট নেই, অথচ বাতি জ্বালানোর তাগিদ আসছে প্রতি মুহূর্তে। একইভাবে একজন মা যখন দিনের পর দিন পরিবারের সবার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের শারীরিক সামর্থ্য আর মানসিক ধৈর্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন, তখনই তিনি এ সিনড্রোমের শিকার হন। মাতৃত্বের এ ক্লান্তি কেবল ঘুমের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব নয়।

লক্ষণ

এ পরিস্থিতির শিকার মায়েরা কেবল মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত হন না, তাদের শরীরও নানা সংকেত দিতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা কিছু সাধারণ লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন:

  • তীব্র অপরাধবোধ: এ অবস্থার সবচেয়ে করুণ দিক হলো অপরাধবোধ। সারাক্ষণ মনে হতে থাকে পরিবারের জন্য যথেষ্ট করতে পারছি না।
  • দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও ক্লান্তি দূর না হওয়া।
  • শারীরিক সমস্যা: ঘন ঘন মাথাব্যথা, পিঠে ব্যথা বা মাংসপেশিতে টান লাগা।
  • খাবারে অনীহা বা অতিরিক্ত খাওয়া: মানসিক চাপের কারণে খাওয়ার রুচি বদলে যাওয়া।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া: ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়া।
  • মেজাজ খিটখিটে হওয়া: সামান্য কারণে সন্তান বা সঙ্গীর ওপর রেগে যাওয়া।
  • আবেগের অসাড়তা: নিজের সন্তান বা সঙ্গীর প্রতি কোনো টান অনুভব না করা বা নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করা।

কেন এমন হয়

গবেষণায় দেখা গেছে সিঙ্গেল মায়েদের তুলনায় সঙ্গী আছে এমন মায়েদের মধ্যে এ সমস্যা প্রকট। আর এর মূল কারণ দায়িত্বের ভারসাম্যহীনতা। ঘরের কাজ ও সন্তান সামলানোর পুরো ভার যখন শুধু মায়ের কাঁধেই থাকে, তখন তিনি একা ও অসহায় বোধ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অনিদ্রা। দিনের পর দিন কম ঘুমানোর ফলে মেজাজ ও শরীর বিগড়ে যায়। পরিবারের সবার যত্ন নিতে গিয়ে নিজের পুষ্টি ও ব্যায়ামের দিকেও নজর দেয়ার সময় বা সুযোগ পান না মায়েরা। সামাজিক প্রত্যাশা আর ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে অন্য মায়েদের পরিপাটি সংসার ও সাজানো জীবন দেখে অনেকে নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন।

উত্তরণের উপায়

ডিপ্লিটেড মাদার সিনড্রোম থেকে মুক্তির জন্য দামী ওষুধের চেয়েও বেশি প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। মায়েদের বুঝতে হবে যে তিনি মানুষ, রোবট নন। সব কিছু নিখুঁত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। সব কিছুতে হ্যাঁ বলার প্রয়োজন নেই। মাঝে মাঝে কোনো কাজ বা আবদারকে না বলা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। কিছু কাজ বাকি থাকলে বা ঘর অগোছালো থাকলেও আকাশ ভেঙে পড়বে না। পরিবারের অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে সঙ্গীকে ঘরের কাজে এবং সন্তান পালনে সমান অংশীদার হতে হবে। সাহায্য নয়, বরং দায়িত্ব ভাগ করে নেয়াই হলো সমাধানের চাবিকাঠি। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা এমন কিছু করা উচিত যা কেবল নিজের জন্য। সেটা হতে পারে বই পড়া, গান শোনা বা স্রেফ চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকা।

আরও