নির্ধারিত সময়ের আগেই পানি ভাঙতে শুরু করেছিল অন্তঃসত্ত্বা তরুণীটির। বাইরে তখন প্রবল তুষারপাত। স্বামী গেছেন স্কুলে। সবচেয়ে কাছের টেলিফোন বুথটাও বিশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। একটা পুরো বাড়িতে সে একা। অগত্যা নিজেকেই করতে হয় সমস্ত ব্যবস্থা। একটা বড় পাত্রে সে পানি গরম করে। নবজাতকের জন্য বিছিয়ে নেয় সাদা চাদর। এভাবেই হান কাংয়ের মায়ের প্রথম সন্তান এসেছিলো পৃথিবীর বুকে। আর শ্বাস নিয়েছিলো মোটে তিনবার। একটা ছোট্ট টুপিতে ঢাকা ছিল তার নরম চুল। সাদা এক জোড়া গ্লাভস নাজুক হাত দুটোকে আগলে রাখতো পরম যত্নে। অথচ এই তিনবার শ্বাসের সমানই ছিল ছোট্ট জীবনটার দৈর্ঘ্য। তিনটা নিঃশ্বাস...তিনটা ক্ষীণ মুহূর্ত। তারপর দীর্ঘ নীরবতা। কাফনের শুভ্রতায় ঢেকে গেছিলো সেই শিউলির মতো সফেদ শবদেহ। স্কুলফেরত তরুণটিকে পাহাড়ের কোলে রেখে আসতে হয় সেই ছোট্ট শিশুটিকে। মৃত বড় বোনের এইসব স্মৃতিই লেখিকা হান কাংকে জড়িয়ে রাখে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া বরফের মতো শুষ্ক প্রতিটা পরিচিত মুখ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এক ধরনের অপরাধবোধ তাকে খুঁচিয়ে যায়। একটা বেঁচে থাকার দুঃখ তার জীবন জুড়ে ছায়ার মতো লেগে থাকে। কারণ তিনি বেঁচে গেছেন, যেখানে আরেকজন বাঁচতে পারেননি।
আসলে আমরা সবাই সবার জীবনের গল্পের পার্শ্বচরিত্র। তাই আমাদের একান্ত গল্প খুঁজতে গেলে সেখানেও অন্য মানুষের দীর্ঘ ছায়া পড়ে। নোবেলজয়ী-বুকার বিজেতা হান কাংয়ের জীবনেও তার না দেখা বোনের স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে একটা সাদা বোবা কুকুরের আস্ত জীবন । এক বন্ধু মারা গিয়েছিল মিলিটারি ট্রেনিং করতে গিয়ে। আরেকজনকে রক্তাক্ত করেছিল অপর পাশ থেকে আসা একটা নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি। দ্য হোয়াইট বুকের পাতার পর পাতাজুড়ে মৃত্যুর শীতল স্পর্শে হারিয়ে যাওয়া এ জীবনগুলোকেই ভাষা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন লেখিকা।
কিছু কিছু গানের সঙ্গে, জায়গার সঙ্গে আমাদের জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। পরে অন্য কোথাও হঠাৎ সেই গান কানে আসলে নস্টালজিয়ার ফ্লাডগেট খুলে যায়। মনে পড়ে যায় গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গল্প, ছেঁড়া ছেঁড়া মুহূর্ত। সময়ের ঘষা লেগে সেসব স্মৃতির শিলালিপি ক্ষয়ে যায় না। রাতভর বেদনার ঝড়ো বাতাসের পরেও অটুট থাকে সেসব অনুভূতির জ্যামিতি।
‘There are certain memories that remain inviolate to the ravages of time. And to those of suffering. It is not true that everything is colored by time and suffering. It is not true that they bring everything to ruin.’
কাফন, গাউন, ছাই, ঢেউ, বালি, সাদা পাখি, ম্যাগনোলিয়া, তুষারকণা, লবণ, সুগারকিউব, হাড়, পেকে যাওয়া চুল, সফেদ প্রজাপতি, চাঁদ, জ্যোৎস্নার রঙ, ধোঁয়া, মেঘ, কুয়াশা; এমন একেকটা সাদা রঙের বস্তুর মধ্য দিয়ে হান কাং বারবার ফিরে গেছেন ব্যক্তিগত শোকের বোতাম খোলা শার্টের আড়ালে থাকা অবারিত বুকের মাঝে। কোনো সুনির্দিষ্ট গল্প এই বইয়ে নেই। কিন্তু প্রতিটা শব্দের আড়ালে মিশে আছে নিঃশব্দ কান্না। মাঝে মাঝে মনোলগের মধ্য দিয়ে লেখিকা যেন আমাদের সাথেই কথা বলতে চেয়েছেন।
‘And she frequently forgot,
That her body(all our bodies) is a house of sand.
That it had shattered and shattering still.
Slipping stubbornly through fingers.’
এ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া, আঙুলের ফাঁক গলে বারবার পিছলে যাওয়া মুহূর্তগুলোতে সাদা পাতা জুড়ে এঁকে দিচ্ছেন কালো কালো অক্ষরের কান্নার ক্বাসিদা।
‘Learning to love life again is a long and complicated process.
Because at some point you will inevitably cast me aside.
When I am at my weakest, when I am most in need of help.
You will turn your back on me, cold and irrevocable.
And that is something perfectly clear to me. And I cannot now return to the time before that knowledge.’
‘দ্য হোয়াইট বুক’ আদতে নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যের একটা মাইলস্টোন। মিলান কুন্দেরা একটা ব্যক্তিগত ডিকশনারি লিখেছিলেন। সেখানে প্রতিটা শব্দকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন নিজস্ব নিয়মে। ‘বিসর্গতে দুঃখ’ বইয়ে শাহাদুজ্জামানও বাংলা বর্ণমালা থেকে একেকটা পছন্দের শব্দ নিয়ে লিখেছেন একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। গুস্তাভ ফ্লবেয়ারও হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে লিখছিলেন ‘আহাম্মকের অভিধান’। এমন ফর্ম নিয়ে এমন এক্সপেরিমেন্ট নতুন নয়। তবে এসবের মধ্যেও ‘দ্য হোয়াইট বুক’ আলাদা জায়গা করে নেয় ব্যক্তিগত ভঙ্গির কারণে। ক্ষতে মলমের প্রলেপ দিতে গিয়ে যেন একটা দীর্ঘ কবিতাই লিখতে চেয়েছিলেন হান কাং। শুধু পথ পাল্টে সেটা রূপ নিয়েছে মধ্যবর্তী কোনো কিছুর।