অন্ধ মেয়েটি জোৎস্না দেখার পর

জীবন-স্রোত উপন্যাস হয়ে ধরা দেয়

গল্পে ফেরার তিয়াশ নিয়ে লেখক আমাদের দেখিয়ে আনে গ্রামান্তরের নদীর আঁকে বাঁকে বয়ে চলা সোনালীর অনচ্ছ-গোঙানী, উপায়হীনতার স্বাভাবিক পরিণতি, শয়তানের নিশ্বাসের আরখেনিক, চেয়ারম্যান চৌধুরী, খান সাহেবের কুটিলতা

জীবন নদীতে বেশ কয়েক ধারাপাতের স্রোত থাকে। সে স্রোত আমাদের গল্পের সাথে ভাসিয়ে নেয়। খড়খড়িপুরের সোনালী কী তেমন একটা স্রোত? ঠিক আলাদা করে ধরা যায় না। যেখানে, তাকে ধর্ষণের পর, অদ্ভুত বিহঙ্গিত হয়ে উঠে বৃষ্টি-স্থিত জোৎস্নামাখা রাত। পাঠকের মনে অবচেতন একটা দাগ দাগিয়ে গল্প এগোয় পানির স্রোত হয়ে৷ লেখক এলোমেলো সুতো মেলে দেন স্রোতের সাথে। গ্রামের বিবিধ চরিত্র যেন আস্তেধীরে ভেসে উঠে। সোনালীর স্বামী প্রফেসর সাহেব এর কাপুরুষতার গল্প যেমন নিম্নমুখি স্রোতের খোঁজ দেয় তখন বৃষ্টিস্নাত রাতে রাস্তায় শক্ত করে হাত ধরা তাহের আমাদের জানিয়ে দেয় উর্ধ্বমুখী স্রোতের গল্প। অজপাড়াগায়ের গল্পের কেন্দ্রে না থেকেও এখানে প্রত্যেকটা চরিত্র যেন বাস্তবতার কোল ঘেঁষে আমাদের জানান দেয় গ্রাম কেমন! স্রোতের গৎবাঁধা ঘোরটেপ হতে আমাদের মুক্তি নেই।

ইমতিয়ার শামীমের কলমে উঠে আসা লেখা আমাদের জীবন নদীর স্রোত আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দৃশ্যমান করে মানুষগুলোর জীবনের আকাঙ্ক্ষা নেহাৎই স্বচ্ছলভাবে ছেলেপুলে বৌ পরিবার নিয়ে কাটিয়ে দেয়া তারা কোনোদিনই শেষ পর্যন্ত সৎ থাকতে পারে না। স্বচ্ছলতার মোহ কোনো না কোনোদিন তাদের সততার পথ থেকে টেনে নামায়, টেনে নামানোর সময় জামার কলার, ঘাড় কিংবা কান ধরে না। হাত ধরে হাসতে-হাসতে কথা বলতে-বলতে নামায়। মানুষগুলো তাই তখনো ভাবে সৎ-ই তো রয়েছে সে। এর মধ্যে অসততা কোথায়! কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ঢোড়া হয়ে যায়, তলানি থাকে না তার। আর আমরা স্রোতের তলায় পরে হাঁসফাঁস করি সোনালি হয়ে কখনো মিলিতা হয়ে। জীবন-স্রোত উপন্যাস হয়ে ধরা দেয় অন্ধ মেয়েটি জোৎস্না দেখার পর হয়ে..

আমাদের গল্প বয়ে চলে আপন গতিতে দ্বন্দ সৎ আর অসৎ-এর থাকে না। দিন শেষে সবার নজর গিয়ে পরে নারীর ওপর। বহমান নদীতে কেন নারীরা স্রোতের নির্ভার বেগ রাখবে? সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে ফল নেয় ধর্ষণের। পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জমাট বাধে পুরুষত্বের সামনে। সে ক্ষোভের বিস্ফোরণের স্বীকার হয় নারীর সতীত্ব। কখনো বা নিথর দেহ।

গল্পে ফেরার তিয়াশ নিয়ে লেখক আমাদের দেখিয়ে আনে গ্রামান্তরের নদীর আঁকে বাঁকে বয়ে চলা সোনালীর অনচ্ছ-গোঙানী, উপায়হীনতার স্বাভাবিক পরিণতি, শয়তানের নিশ্বাসের আরখেনিক, চেয়ারম্যান চৌধুরী, খান সাহেবের কুটিলতা।

যেভাবে গল্পের ধারাপাত মেশে স্রোত হয়ে, যেভাবে স্বপ্ন দলিত হয়, যেভাবে পাড়ের বালুরা ক্ষনিক লিখিত থাকে নদীর কোলে—আমাদের অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর ঘুম থেকে জেগে উঠে একরাশ ক্ষোভ নিয়ে, পাঠকের কাছে। অমোঘ গল্পের নিয়তি আমাদের নিস্ফল আক্রোশে জানান দিয়ে যায় এ গল্প প্রতিদিনের প্রতিবেলার....

আরও