মোবাইলে এমন কোনো বার্তা আছে, যার উত্তর দেবেন বলে ভেবেও আর দেয়া হয়নি। আলমারিতে হয়তো একটি পোশাক পড়ে আছে, সেলাই করাতে হবে বলে দিনের পর দিন ভাবছেন। অনলাইনে কিছু কেনাকাটা করার কথা ছিল, তাও বাকি। আবার কারো সঙ্গে এমন কোনো অস্বস্তিকর কথোপকথনও থাকতে পারে, যেটি এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক দিন ধরে।
কাজগুলো হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু প্রতিবার সেগুলোর কথা মাথায় এলেই মনে হয়—এটা তো এখনো করা হয়নি।
এভাবেই ছোট-বড় অসংখ্য অসমাপ্ত কাজ আমাদের মাথায় জমতে থাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘ওপেন লুপ’। অর্থাৎ যে কাজগুলো এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু মাথা থেকেও সরছে না। অনেকটা কম্পিউটারে একসঙ্গে অসংখ্য ব্রাউজার ট্যাব খুলে রাখার মতো। প্রতিটি ট্যাব হয়তো আলাদা করে খুব বেশি সমস্যা তৈরি করছে না। কিন্তু সব মিলিয়ে কম্পিউটার যেমন ধীর হয়ে যায়, তেমনি অসমাপ্ত কাজের চাপও ধীরে ধীরে আপনাকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন পডকাস্টে ‘ওপেন লুপ’ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অনেকে বলছেন, নিজের জীবনের এসব অসমাপ্ত কাজ চিহ্নিত করতে পারার পর তারা বুঝতে পেরেছেন—কেন ছোটখাটো বিষয়ও বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে।
কেন আমরা কাজ ফেলে রাখি?
কোনো কাজ করতে হবে জেনেও আমরা কেন সেটি এড়িয়ে যাই? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে কাজটি নিয়ে আমাদের অনুভূতি। কোনো কাজ সময়সাপেক্ষ মনে হতে পারে, সামলাতে বেশ বেগ পেতে হবে বলে মনে হতে পারে। অথবা হতে পারে মানসিকভাবে অস্বস্তিকর।
কোনো বার্তার উত্তর দিতে দেরি হতে পারে, কারণ ঠিক কী লিখবেন তা বুঝতে পারছেন না। বন্ধুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথোপকথন এড়িয়ে যেতে পারেন, কারণ তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় কাজ করছে। আবার কোনো কাজ নিখুঁতভাবে করতে না পারার আশঙ্কাও সেটি শুরু করতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ভারা সারিপাল্লির মতে, কোনো কাজ ফেলে রাখার সময় আমরা সাধারণত ভবিষ্যতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে ভাবি না। বরং কাজটি করলে তখন যে অস্বস্তি হবে, সেটি এড়াতেই বেশি মনোযোগী থাকি। কিন্তু কাজটি ফেলে রাখলেও সেটি শেষ হয়ে যায় না; বারবার মনে পড়ে এবং একসময় বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অসমাপ্ত কাজও বাড়ায় মানসিক ক্লান্তি
দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখার অভ্যাসের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির সামাজিক ও স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফুশিয়া সিরোইস। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করছেন।
তার মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সময়ের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়া বা একাকিত্বের মতো সমস্যার সঙ্গে কাজ ফেলে রাখার অভ্যাসের সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে সব সময় এর কারণ এক নয়। অনেকের ক্ষেত্রে দায়িত্বের পরিমাণই হয়তো বেশি থাকে। কাজ, পরিবার ও অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যে নতুন কোনো দায়িত্ব নেয়ার মতো মানসিক শক্তি থাকে না। আবার অতিরিক্ত সময় মোবাইল বা অন্য কোনো বিষয়ে ব্যয় করাও মনোযোগ ও শক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
কখনো কখনো কাজ ফেলে রাখার পেছনে আরো জটিল কারণও থাকতে পারে। বিষণ্ণতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা বা এডিএইচডির (মনোযোগের ঘাটতি ও অতিরিক্ত চঞ্চলতাজনিত সমস্যা) মতো কিছু অবস্থার কারণেও কোনো কাজ শুরু করা বা শেষ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
সব কাজ একসঙ্গে শেষ করার প্রয়োজন নেই
অসমাপ্ত কাজের তালিকা দেখে অনেক সময় মনে হতে পারে, একদিনেই সব কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। কিন্তু সেটিই আবার শুরু করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পরিবর্তে ছোট করে শুরু করাও কার্যকর হতে পারে।
যেমন, নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করতে চাইলে প্রথম দিন হয়তো শুধু জিম পর্যন্ত যাওয়ার লক্ষ্য রাখতে পারেন। পরের দিন ব্যায়ামের পোশাক পরে যেতে পারেন। এরপর পাঁচ মিনিট ব্যায়াম করলেও সেটিকে শুরু হিসেবে ধরা যায়। এভাবে খুব ছোট পদক্ষেপও ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
অসমাপ্ত কাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পুরো ঘর পরিষ্কার করার কথা ভেবে কাজ শুরু না করার চেয়ে, হয়তো শুধু টেবিলটি গুছিয়ে নেয়া সহজ। অনেক দিনের জমে থাকা বার্তার সব কটির উত্তর একসঙ্গে না দিয়ে একটি দিয়ে শুরু করা যায়। এড়িয়ে যাওয়া কোনো ফোনকলের জন্য শুধু নম্বরটি খুঁজে বের করাও হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ।
মূল বিষয় হলো, কাজটিকে এমন ছোট অংশে ভাগ করা, যাতে শুরু করাটা আর কঠিন মনে না হয়।
নিজেকে দোষারোপ না করাই ভালো
কাজ ফেলে রাখার পর অনেকের মধ্যেই অপরাধবোধ ও লজ্জা তৈরি হয়। কিন্তু এসব অনুভূতি অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তোলে। আমি এত অলস কেন, এত সহজ কাজও করতে পারছি না—এ ধরনের চিন্তা কাজ শুরু করার পরিবর্তে মানুষকে আরো পিছিয়ে দিতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বরং নিজের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হওয়ার পরামর্শ দেন।
কেন কাজটি এড়িয়ে যাচ্ছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে— কাজটি কি সত্যিই খুব কঠিন, নাকি শুরু করার আগেই সেটিকে কঠিন বলে মনে হচ্ছে? সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে? আর সেটি ঘটলেও পরিস্থিতি সামলানো কি একেবারেই অসম্ভব?
অনেক সময় আমরা কোনো পরিস্থিতিকে বাস্তবের চেয়ে অনেকবেশি কঠিন হিসেবে কল্পনা করি। কোনো কোনো কাজের অর্থ বা গুরুত্ব খুঁজে দেখাও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। যেমন, ঘর পরিষ্কার করছেন শুধু অন্য কেউ কী ভাববে, তা নিয়ে চিন্তা করে নয় বরং নিজের জন্য একটি আরামদায়ক জায়গা তৈরি করতেও। চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট এড়িয়ে যাচ্ছেন, কারণ কোনো খারাপ খবর শুনতে চান না—কিন্তু সমস্যাটি না জানলে তো সেটি চলেও যাবে না। কাজটি শেষ হলে কী ধরনের স্বস্তি মিলতে পারে, সেটিও ভাবা যেতে পারে। সব অসমাপ্ত কাজ একদিনে শেষ করার প্রয়োজন নেই। যে কাজগুলো বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ কাজটি দিয়েই শুরু করা যেতে পারে।
সিএনএন অবলম্বনে