পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা, অনিয়মিত মলত্যাগ আর দীর্ঘদিনের পেটের গোলমাল— এ সমস্যায় অনেকেই ভুগছে। সাধারণ ভাষায় একে ‘পুরাতন আমাশয়’ বলা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ বা আইবিএস। এটি পরিপাকতন্ত্রের একটি ফাংশনাল সমস্যা, যেখানে গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না কিন্তু কাজের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়।
রোগের লক্ষণ ও ধরন
আইবিএস মূলত পেট ব্যথা ও মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা এবং পেট ফাঁপা ভাব।
- অতিরিক্ত বায়ু ত্যাগ ও পেটে শব্দ হওয়া।
- মলের সঙ্গে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বা মিউকাস যাওয়া।
- মলত্যাগ অসম্পূর্ণ হওয়ার অনুভূতি।
লক্ষণ অনুযায়ী আইবিএস মূলত তিন ধরনের:
আইবিএস-ডি: পেট ব্যথার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া।
আইবিএস-সি: পেট ব্যথার সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য।
আইবিএস-এম: যখন ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য—দুটোই পর্যায়ক্রমে দেখা দেয়।
কারণ
আইবিএসের সঠিক কারণ আজও অজানা। তবে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে পরিপাকতন্ত্র থেকে স্নায়ুতে সংকেত আদান-প্রদানে সমস্যা, অন্ত্রের অস্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণ, অতি-সংবেদনশীলতা এবং অন্ত্রে উপকারী ও অপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করা হয়। এছাড়া মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা এ সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আইবিএস রোগীদের ৪০-৬০ শতাংশই মানসিক চাপে ভোগেন। এমনকি পুরুষদের তুলনায় নারীরা আইবিএসে বেশি ভুগছেন।
নির্ণয় ও পরীক্ষা
আইবিএস নির্ণয়ের কোনো নির্দিষ্ট একক পরীক্ষা নেই। সাধারণত রোগীর জীবন যাপন ও লক্ষণ দেখে এটি শনাক্ত করা হয়। তবে অন্ত্রের অন্য কোনো গুরুতর সমস্যা আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকরা রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি কিংবা এন্ডোস্কপি বা কোলনোস্কপি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস: সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি
আইবিএস পুরোপুরি নির্মূল করার নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তবে শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
- খাবার শনাক্তকরণ: আইবিএস রোগীদের নির্দিষ্ট কোনো খাবার তালিকা নেই। রোগীকে নিজেই চিহ্নিত করতে হবে কোন খাবারে তার সমস্যা হচ্ছে। সাধারণত দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, শাক, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হয়।
- ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের পার্থক্য: যাদের প্রধান সমস্যা ডায়রিয়া, তাদের খোসাযুক্ত ফল, দানা শস্য ও বাদাম এড়িয়ে চলা উচিত। অন্যদিকে, কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে ওটস, বার্লি, কলা, আপেল ও প্রচুর পানি পান করতে হবে।
- মানসিক প্রশান্তি: আইবিএস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান ও পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি।
কখন সতর্ক হতে হবে?
আইবিএস থেকে বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। তবে কিছু ‘বিপদ চিহ্ন’ বা রেড ফ্ল্যাগ থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
- মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া।
- রাতে ঘুমের মধ্যে মলত্যাগের বেগ হওয়া।
- রক্তশূন্যতা বা পেটে চাকা অনুভব করা।