ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জেন অস্টিন, রোমান্টিক গল্পকার হিসেবে তার পরিচিতি বিশ্বজোড়া। প্রতিটি উপন্যাসে নায়িকার জীবনপ্রবাহকে সোনালী ফিতার মতো গুটিয়ে নেন তিনি। তার গল্পে অধিকাংশ নায়িকারই বিয়ে হয়, আপাত দৃষ্টিতে সুন্দর সমাপ্তি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যিনি অন্যদের জীবনকে সুখী দেখাতে বিয়েকে বেছে নিয়েছিলেন, তিনি নিজে সেই পথে হাঁটেননি।
তার জীবনে অবশ্য প্রেম ছিল। জেনের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন তরুণ আইরিশ যুবক থমাস লেফ্রয়। সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তারা। বিয়ের প্রস্তাবও এসেছিল। ১৮০২ সালে বন্ধু হ্যারিস বিগ-উইথারের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন জেন অস্টিন। কিন্তু পরের দিনই তা ভেঙে দেন। নিজের ইচ্ছাতেই একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কেন?
জেন অস্টিন (১৭৭৫-১৮১৭)
জেনের অধিকাংশ উপন্যাস প্রেম ও বিবাহকে কেন্দ্র করে লেখা। আর একারণেই সমালোচকদের অনেকে তার লেখাকে হালকা বা তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটু গভীরে তলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, প্রতিটি প্রেম, প্রতিটি প্রস্তাবের আড়ালে তিনি তীক্ষ্ণভাবে দেখিয়েছেন তৎকালীন সমাজের শ্রেণিবিভাজন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নৈতিকতা ও জর্জিয়ান ইংল্যান্ডের নারীদের সীমিত জীবনচয়নের কথা।
তার নায়িকারা বুদ্ধিমান, উপযুক্ত, অনেক সময় তারা পুরুষদের চেয়েও বিচক্ষণ। কিন্তু মধ্যবিত্ত নারী হিসেবে তারা চাকরি করতে পারে না। জীবনে স্থিতি বা নিরাপত্তার একমাত্র উপায়—বিয়ে।
এ নিষ্ঠুর বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’। ১৮১৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটির গল্প বিস্তারলাভ করে প্রাণবন্ত, সপ্রতিভ, সমাজের নিয়মে অনাস্থাশীল এলিজাবেথ বেনেটকে ঘিরে। কিন্তু তার মা মেয়েদের ‘উপযুক্ত’ বিয়ে দেয়ার জন্য উদগ্রীব। অভিজাত, ধনবান মি. বিংলি ও তার অহংকারী কিন্তু আকর্ষণীয় বন্ধু মি. ডার্সিকে দেখার পর সে চেষ্টা আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস উপন্যাসজুড়ে লিজি বেনেট ও তার আশপাশের নারীদের বিয়েকে ঘিরে নানা ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জেন এ উপন্যাসের প্রতিটি বিয়েকে খুব সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন। তার বর্ণনায় বিয়ে শুধু সুখী সমাপ্তি নয়; বরং নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন সিদ্ধান্ত হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। তার উপন্যাসে বিয়ে ছিল সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার জটিল বহিঃপ্রকাশ।
জেন অস্টিনের উপন্যাস ও ব্যক্তিগত জীবন বিশ্লেষণ করেছেন নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মেগ কোবজা। তিনি বলেন, ‘রোমান্সের আড়ালে সমাজের জটিল ঘাত-প্রতিঘাত তুলে ধরেছেন জেন। তিনি জানতেন বাস্তব জীবনে নারীর সীমাবদ্ধতা কতটা কঠিন। তার উপন্যাসে আমরা দেখি, আর্থিক নিরাপত্তা নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য করছে। জেন নিজেও আর্থিকভাবে বাবা ও ভাইদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।’
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিশেষজ্ঞ অক্টাভিয়া কক্স ও ইয়র্ক সেন্ট জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডাম জে. স্মিথ-ও এ বিষয়ে একমত। তারা মনে করেন, প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস মূলত সুখ খুঁজে পাওয়ার গল্প হলেও এর ভেতরে সমাজ, মানুষ ও জীবনের পাঠ লুকিয়ে আছে।