প্রকৃতির প্রতি মানুষের টান সহজাত। এ কারণে ইট-পাথরের নগরজীবনকে ছুটি দিয়ে প্রায়ই পাহাড়-সমুদ্রে বেরিয়ে আসে মানুষ। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে যে কারোরই আলাদা রকম ভালো লাগা তৈরি হয়। প্রাণবন্ত মন আর ভরপুর স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে উপভোগ করা যায় জীবনের সব আয়োজন।
আমাদের কর্মব্যস্ত প্রযুক্তিনির্ভর জীবন দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে সবুজ প্রকৃতির কাছ থেকে। প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব প্রতিনিয়তই বাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও একাকিত্ব। ঝঁকির মুখে পড়ছে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্য। প্রায় পুরো বিশ্বেরই চিত্র যেন এটাই! এমন পরিস্থিতিতে ঘরের ভেতরই প্রকৃতি সাজানোর বন্দোবস্ত করেছেন আধুনিক অন্দরসজ্জাবিদররা, যা বায়োফিলিক ডিজাইন নামে পরিচিত।
বায়োফিলিক ডিজাইন কী?
সহজ কথায়, এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে স্থপতি বা ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা বিল্ডিং স্পেসে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলোকে ব্যবহার করেন। বায়োফিলিক ডিজাইনকে তাই বলা যায় সবুজ স্থাপত্য।
১৯৮৪ সালে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও উইলসন সবুজ স্থাপত্য বা বায়োফিলিক ডিজাইনের ধারণাটি প্রথম চালু করেছিলেন। অবশ্য প্রাথমিকভাবে ধারণাটি ছিল মানুষকে বাড়ির মাঝে আরো বেশি করে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বিকশিত হয়েছে সেই ধারণা।
বায়োফিলিকের ৬ নীতি
বায়োফিলিক ডিজাইন এর ৬টি নীতি রয়েছে যা প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ডিজাইনের ধরণকেও প্রভাবিত করে। এগুলো হচ্ছে-
- পরিবেশগত ফিচার
- প্রাকৃতিক আকার ও আকৃতি
- নিরাময় প্রক্রিয়া
- আলো ও স্পেস
- স্পেস এর সুব্যবহার
- মানব-প্রকৃতির বিদ্যমান সম্পর্ক
বায়োফিলিক ডিজাইনে যা খেয়াল রাখা হয়
বায়োফিলিক ডিজাইন মানে ঘর শুধু গাছপালা দিয়ে ভরিয়ে ফেলা নয় কিন্তু। প্রাকৃতিক বিভিন্ন অনুসঙ্গ কোথায়, কেন এবং কীভাবে রাখা হবে সামগ্রিকভাবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার
বায়োফিলিক ডিজাইনের একটি প্রধান উপাদান হলো প্রাকৃতিক আলো। ঘরের ভেতরে যতটা সম্ভব সূর্যের আলো প্রবেশ করানোই এর প্রধান লক্ষ্য। এ ডিজাইনে দেয়ালে বা ছাদে বড় কাচের জানালা, ঘুলঘুলি ও স্বচ্ছ বিভাজক ব্যবহার করে ঘরের উজ্জ্বলতা বাড়ানো হয়।
প্রাকৃতিক উপকরণ ও আমেজ
বায়োফিলিক ডিজাইনে ঘরের আসবাব, দেয়াল, মেঝে বা ছাদে কাঠ, পাথর, বাঁশ, মাটি ও গাছের শেকড় দিয়ে তৈরি উপকরণ ব্যবহার করে প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়। এমনকি টাইলসেও ব্যবহার করা হয় কাঠ, মাটি বা পাথুরে আমেজ যা যান্ত্রিক জীবনে এনে দেয় প্রকৃতির ছোঁয়া।
গাছপালা
ঘরের মধ্যে ছোট বা মাঝারি গাছ রাখা হয় এতে। এগুলো শুধু ঘরের সাজসজ্জাই নয়, বরং বায়ুর মানও উন্নত করে। কারণ, ইনডোর প্লান্ট ঘরের কার্বন-ডাই–অক্সাইড শোষণ করে। আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় রাখে।
লিভিং ওয়াল
সবুজ গাছের স্তর দিয়ে সাজানো দেয়ালকে বলা হয় লিভিং ওয়াল । এ ধরনের দেয়ালে জীবন্ত গাছপালা সেঁটে দেয়া থাকে। একে ভার্টিক্যাল গার্ডেনও বলা হয়। এটি দেয়ালের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
অ্যাট্রিয়াম
ভবনের ভেতর খোলা ছাদ বা অ্যাট্রিয়াম বায়োফিলিক ডিজাইনের অন্যতম উপাদান। বায়োফিলিক ডিজাইনে এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যেন সূর্যের আলো, বাতাস ও গাছপালা একত্রে উপস্থিত থাকে।
জলধারা ও বহমান পানি
বায়োফিলিক ডিজাইনে ঘরের ভেতরে ফোয়ারা বা ছোট জলপ্রপাতের মতো উপাদান যোগ করা হয়। বহমান পানির কলতান মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে ভালো অনুভূতি সৃষ্টি করে।
যে কারণে জনপ্রিয় বায়োফিলিক ডিজাইন
বায়োফিলিক ডিজাইনের বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে আরো বেশি উত্সাহিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয় যে বাড়ির গাছপালা বা প্রাকৃতিক আলোর মাধ্যমে, মানুষ প্রকৃতির সাথে আরো বেশি সংযুক্ত থাকতে পারে এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। এ কারণেই দীর্ঘায়ু লাভ করতে এবং সুস্বাস্থ্য এর অধিকারী হতে এটি এখন অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ডিজাইন ট্রেন্ড।
এছাড়া এখন মানুষ পরিবেশ বান্ধব কাঠামোর প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে বায়োফিলিক ডিজাইন এর ধারনাটি তাঁদের মধ্যেও একটি বাড়তি আবেদন সৃষ্টি করছে।
বায়োফিলিক ডিজাইনের পরিবেশগত উপকারিতা
কেবল সামাজিক বা স্বাস্থ্যগত সুবিধাই নয়, এর কিছু পরিবেশগত উপকারিতাও রয়েছে। বায়োফিলিক ডিজাইনের অন্যতম সুন্দর দিকটি হল এখানে মাঝারি আকৃতির গাছপালা, ছোট ছোট পাত্রে ইনডোর প্ল্যান্টস, দেয়ালের চারপাশে ঝুলানো গাছের ঝোপ ইত্যাদি দিয়ে পুরো ইন্টেরিয়রটা ডিজাইন করা হয়। যা কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে শোষণ করে নিয়ে ঘরের মাঝে বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহ করে। যা শক্তির অপচয় রোধ করে এবং বৈদ্যুতিক বিলের মত দীর্ঘমেয়াদী খরচগুলো কমিয়ে আপনাকে সাশ্রয়ী করে তোলে।