সন্তান জন্মের আগে থেকেই হবু মায়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। হরমোনের ওঠানামা থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃতি একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাবা হওয়ার দৌড়ে পুরুষরাও পিছিয়ে নেই। কোনো নারী গর্ভধারণ করলে শুধু তিনিই নন, তার সঙ্গীর শরীর এবং মস্তিস্কও অদ্ভুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।
টেস্টোস্টেরনের পতন ও মমত্বের উত্থান
সাধারণত পুরুষত্বের হরমোন হিসেবে পরিচিত টেস্টোস্টেরন বাবা হওয়ার প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফিলিপাইনের সেবু সিটিতে ৬২৪ জন পুরুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বাবা হয়েছেন এবং সন্তানদের লালন-পালনে সরাসরি সময় দিয়েছেন, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
গবেষকদের মতে, এটি প্রকৃতির এক বিশেষ কৌশল। টেস্টোস্টেরন কমলে পুরুষের আক্রমণাত্মক মনোভাব কমে এবং সে অনেক বেশি ধৈর্যশীল ও যত্নশীল হয়ে ওঠে। এমনকি শিশুর কান্নার প্রতি বাবার সংবেদনশীলতাও বেড়ে যায় এ হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে।
অক্সিটোসিন বা লাভ হরমোনের উত্থান
মায়েদের ক্ষেত্রে ‘লাভ হরমোন’ বা অক্সিটোসিন স্তন্যদান ও প্রসবের সময় নিঃসৃত হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন বাবারা যখন তাদের সন্তানদের স্পর্শ করেন বা তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করেন, তখন তাদের শরীরেও অক্সিটোসিনের জোয়ার বয়ে যায়। বিশেষ করে যে বাবারা সন্তানের জন্মের পরপরই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তাদের মধ্যে এই হরমোনগত সংযোগ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। এটি বাবাকে সন্তানের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করে।
মস্তিষ্কের পুনর্গঠন: ‘ড্যাড ব্রেইন’
মনোবিজ্ঞানী ডার্বি স্যাক্সবি এবং তার দল এক গবেষণায় দেখেছেন, প্রথমবার বাবা হওয়া পুরুষদের মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ বা নিউরাল কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনকে স্যাক্সবি ‘দ্বিতীয় বয়ঃসন্ধি’র সাথে তুলনা করেছেন। যেমনভাবে বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্ক নতুন উদ্দীপনার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, বাবা হওয়ার সময়ও শিশুকে সুরক্ষা দেয়া এবং তার প্রয়োজন বোঝার জন্য মস্তিষ্ক নিজেকে নতুন করে সাজায়।
বাবার এ জৈবিক পরিবর্তন কেবল পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে প্রকাশিত ২৯২টি পরিবারের ওপর পরিচালিত ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা বাবার বেশি মনোযোগ ও সান্নিধ্য পায়, তাদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো থাকে।
বাবার এ ‘জৈবিক রূপান্তর’ সফল করতে গর্ভাবস্থা থেকেই তাকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা। আল্ট্রাসাউন্ড করার সময় পাশে থাকা, প্রসব-পূর্ব চেকআপে যাওয়া এবং শিশুর জন্মের পর থেকেই সরাসরি যত্ন নেয়া বাবার ভেতরের সুপ্ত ‘পৈতৃক প্রবৃত্তি’কে জাগিয়ে তোলে।
সূত্র: বিবিসি ও সায়েন্স ডেইলি