বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমাদের একটা আফসোস আছে। সেই আফসোসের আবার শাখা আছে কয়েকটা। প্রথম শাখা, বাংলা সাহিত্যে নাকি ভালো লেখা নেই। দ্বিতীয় শাখা, ভালো যা আছে তা নিয়ে আলাপ নেই। এইগুলোর মধ্যেই যে কয়জন লেখকের প্রসঙ্গ আসে বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ল্যাসিকের কাতারে তার মধ্যে শীর্ষে থাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম। কিন্তু তাকে নিয়েও আলাপটা ইন্টেলেকচুয়াল বোরিং সার্কিটের বাইরে কই? সেই সংষ্কৃতির মধ্যেই কেউ যদি ইলিয়াসকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চায়? আসে আরেকটা আফসোসের জায়গা—আমাদের সিনেমার হালচাল? আর সবচেয়ে বড় আফসোস, সময়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বদলে যাওয়া ন্যারেটিভ। সুহান রিজওয়ানের অন্য কারও খোঁয়ারিতে এই বিষয়গুলো জ্বলজ্বল করে।
এই লেখার সূচনা অংশ দেখে মনে হতে পারে, উপন্যাসটা বোধহয় কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আফসোসের বহর নিয়ে রচিত। আদতে তা নয়। অন্য কারো খোঁয়ারি কতগুলো গল্প বহন করে। একটা উপন্যাসের কাজ অনেকগুলো গল্প বলা। এই উপন্যাসে তা আছে। একটা গল্প সাজ্জাদের, একটা গল্প ইলিয়াসের, একটা গল্প হিমেল কিংবা খোদ সুহান রিজওয়ানের। সেই গল্পগুলোর মধ্যে থাকে আরো গল্প। সেখানেই ইলিয়াসের ভূবন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাস্তবতা ও বদলে যাওয়া ন্যারেটিভ, আমাদের সিনেমাপাড়ার চিত্র উঠে আসে। সেই সঙ্গে থাকে মিথ। গ্রাম বাংলার কালচার আর তার সমান্তরালে—এই শহরের মানুষ ও তার যাপিত জীবন।
হিমেল একটা সিনেমা বানাতে চায়। সৎ সিনেমা। কিন্তু সাকিবের কনটেন্ট টিমে থাকা হিমেল খুব বেশিকিছু কর উঠতে পারে না। সবখানেই একটা করে সীমাবদ্ধতা। নিকিপাড়ায় (নিকেতন) সে ঘুরে বেড়ায় একটা সুযোগের অপেক্ষায়। সবশেষে জুটে যায় অনীম সৈয়দের সঙ্গে। বানাতে চায় ইলিয়াসকে নিয়ে তার সিনেমাটা। আর হিমেলের এই যাত্রার সমান্তরালে সুহান রিজওয়ান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের একটি গল্প ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমার একটা আফসোস, এখানে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক চরিত্র নির্ভর উপন্যাস কম। যা-ও লেখা হয়েছে তাতে একটা খামতি চোখে পড়ে। তুলনায় যাচ্ছি না। না লেখার কারণও আছে। অন্য কারো খোঁয়ারি উপন্যাসেও সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সিনেমার প্রডিউসার খুঁজতে গিয়ে হিমেল আর অনীম তাদের কাছ থেকে শোনে ‘কী কী বিষয় থাকলে সিনেমার জন্য তারা ফান্ড পাবে’। আর সেসব রাখতে হলে সিনেমাটা অবশ্যই তাদের থাকবে না। সেই সূত্রে চরিত্রদের মুখ থেকেই আমরা শুনি এই দেশে কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লিখতে গেলে তাদের মুরিদরাই তম্বি শুরু করে। মানুষের গ্রে এরিয়া দেখতে তারা রাজি না।
ছবি: সুহান রিজওয়ানের ফেসবুক
সুহান রিজওয়ানের এই উপন্যাসে সমান্তরালে তিনটা গল্প চলে—ইলিয়াস, সাজ্জাদ ও হিমেল। ইলিয়াস ঐতিহাসিক, বাস্তব চরিত্র। সাজ্জাদ এই বাংলার যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন। আর হিমেল আমাদের পরিচিত এই সময়ের যে কোনো চিত্রনাট্যকার হতে পারে। তবে উপন্যাস অনুসারে সাজ্জাদ চরিত্রটি ইলিয়াসের খাতা থেকে আসা যাকে নিয়ে ইলিয়াস তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি লিখতে চেয়েছিলেন। ইলিয়াসকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে রিজওয়ান ইলিয়াসের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে দায়বদ্ধ থেকেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে পড়াশোনার সূত্রে তার সম্পর্কে যা জেনেছি, যা জরুরী তা এনেছেন রিজওয়ান। ইলিয়াসের জীবন, যাপন, ভাষা তার আশেপাশের চরিত্ররা সুহানের উপন্যাসে এসেছে। তাদের মূর্ত করে তুলেছেন। সেই সঙ্গে তিনি এনেছেন ইলিয়াসের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, তার উপন্যাসের স্থান ও চরিত্রদের। তমিজের বাপ স্পষ্ট হয় আমাদের সামনে। আমরা দেখতে পাই কাৎলাহার বিল। আমরা দেখতে পাই সাজ্জাদের দহন। নাম উল্লেখ না করেও সাজ্জাদের গল্পে তিনি আমাদের নিয়ে যান হুমায়ূন আহমেদের কাছে। আমরা দেখি তরুণ শাহাদুজ্জামান, আনু মুহম্মদ, মিহির সেনগুপ্ত থেকে মহাশ্বেতা দেবীকে।
সুহান রিজওয়ানের ভাষা, গদ্য পোক্ত। তিনি চরিত্র ও পরিস্থিতি অনুসারে ভাষা বদলেছেন। তার অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় এই উপন্যাসকেও (ব্যক্তিগত মত) কনক্রিট মনে হয়েছে। লেখক জানতেন তিনি কী লিখছেন, কী বলতে চান, কতটা বলতে চান। সে কারণেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানও মূর্ত তার লেখায়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশের বদলে যাওয়া পরিস্থিতির পাশে উঠে আসে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। যেখানে মানুষ সব বোঝে কিন্তু বলতে পারে না কিছু।
এই সবকিছুর মধ্যে সুহান তার উপন্যাসের পাঠকের সামনে বারবার নিয়ে আসেন ইলিয়াসকে। কেননা এটিই তার লক্ষ্য। তাই অনীম ও হিমেলকে নিয়ে যান কাৎলাহারে। সামান্য উন্নাসিক অনীম সেখানে গিয়ে খুঁজে পায় সহজাত মিথকে। সেই জায়গায় মিথ, বাস্তব আর উপন্যাস তথা গল্প একাকার হয়ে যায়। পাঠকও জড়িয়ে যায় অনীমের মতো। সেও চিনতে চায় উপন্যাসের চরিত্রদের। খুঁজতে চায় কোনো খোয়াবনামা।