বুক রিভিউ

হিসাবরক্ষকের কার্যকর ডেস্ক-রেফারেন্স আইএফআরএস অ্যাপ্লিকেশন

একজন করপোরেট হিসাবরক্ষক বা ফাইন্যান্স ম্যানেজারের নিত্যদিনের কাজে মুনাফা চিহ্নিতকরণ, লিজ হিসাবায়ন, ইমপেয়ারমেন্ট, ফেয়ার ভ্যালু পরিমাপসহ নানা জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ বইয়ের ফ্লো-চার্ট ও ধাপে ধাপে সমাধান পদ্ধতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, ফলে সময় বাঁচবে এবং ভুল হিসাবায়নের ঝুঁকি কমবে।

দেশে বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের প্রসার ঘটায় যেকোনো প্রতিষ্ঠানে হিসাববিজ্ঞানের পরিধি শুধু ‘আয়-ব্যায়ের হিসেবে’ সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলগত হাতিয়ারও হয়ে উঠেছে এটি। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশী অনেক শিক্ষার্থী তার মেজর হিসেবে ব্যবসায় অনুষদের কোনো বিভাগকে বাছাই করলে হিসাববিজ্ঞানকেই বেছে নেন।

তরুণদের মধ্যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএমএ) পেশার প্রতি আগ্রহ দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। কারণ ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার এ পেশার সামাজিক ও করপোরেট মর্যাদা অনেক। এছাড়া যারা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) হতে চান তাদেরও হিসাববিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। দেশের অভ্যন্তরে এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টস বিভাগের প্রধানদের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও উচ্চ বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা বিনিয়োগ আকর্ষণে স্বচ্ছতা: বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য স্থানীয় কোম্পানির হিসাবের স্বচ্ছতা জরুরি।

নিখুঁত হিসাববিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত প্র্যাকটিস বইয়ের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আর্থিক রিপোর্টিং মানদণ্ড (আইএফআরএস) এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং মানদণ্ডের (আইএএস) প্রয়োগ কেবল একটি ভালো চর্চায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন আইনি বাধ্যবাধকতা। তাই আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় রাখার কোনো বিকল্প নেই। আর চর্চাকে সহজ করতে সম্প্রতি বাজারে এসেছে আইএফআরএস অ্যাপ্লিকেশন (IFRS Application) নামে বইটি।

আইএফআরএস ও আইএএস নিয়ে আমাদের দেশে তাত্ত্বিক বইয়ের সংকট নেই, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ শেখার মতো হাতেকলমে অনুশীলনভিত্তিক বইয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সে শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা বইটিতে রয়েছে।

বইটির ইতিবাচক দিক হলো লেখকরা তত্ত্বের গুরুত্ব না কমিয়ে বরং জটিল স্ট্যান্ডার্ডগুলোকে উদাহরণ, সমস্যা-সমাধান এবং বাস্তব কেস স্টাডির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। ফলে শিক্ষার্থী বা পেশাজীবী সবাই বইটি থেকে সর্বোচ্চ অনুশীলন সহায়তা পাবেন।

কেন বইটি অবশ্য পাঠ্য?

বইটিকে সহজবোধ্য ও প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য ৩০টিরও বেশি বাস্তব কেস স্টাডি (রিয়েল লাইফ কেইস স্টাডি) তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তব অনুশীলনের অংশ হিসেবে দেশ ও বিদেশের শীর্ষস্থানীয় ২০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং প্র্যাকটিসের বিশ্লেষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু জটিল বিষয়কে অল্প সময়ে ও সহজে বোঝার জন্য ফ্লো চার্টের ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু একটানা টেক্সট দিয়ে বইটি লেখা হয়নি।

করপোরেট সেক্টরে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি, নিরীক্ষা কিংবা ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আইএফআরএস ও আইএএসের সঠিক প্রয়োগ একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ফাইন্যান্স প্রফেশনালের দক্ষতার একটি মূল মানদণ্ড। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ডের তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও সেটিকে কোম্পানির প্রকৃত লেনদেন বা আর্থিক বিবরণীতে প্রয়োগ করাটাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ। ‘আইএফআরএস অ্যাপ্লিকেশন’ বইটি ঠিক এ সমস্যাই পূরণ করতে পারবে।

বইয়ের বাস্তব কোম্পানির উদাহরণ ও কেস স্টাডির মাধ্যমে জটিল স্ট্যান্ডার্ড প্রয়োগের প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়, যা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। এছাড়া অনুশীলনের জন্য ২৮৪টি সমস্যা ও সমাধান থাকায় নতুন কোনো লেনদেন বা পরিস্থিতিতে কীভাবে হিসাবায়ন করতে হবে, তার একটি রেফারেন্স হিসেবে বইটি ব্যবহার করা যায়।

আবার ২০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ পেশাজীবীদের প্রকৃত করপোরেট রিপোর্টিং প্র্যাকটিস সম্পর্কে ধারণা দেয়, যা বেঞ্চমার্কিং বা তুলনামূলক বিশ্লেষণে সহায়ক। সিএ, সিএমএ ও এসিসিএর মতো পেশাগত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এটি একটি নির্ভরযোগ্য অনুশীলন-সহায়ক বই হিসেবে কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, ক্লাসরুমের পাঠকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে।

বইটি বাস্তবে যেভাবে উপকারে আসতে পারে

একজন করপোরেট হিসাবরক্ষক বা ফাইন্যান্স ম্যানেজারের নিত্যদিনের কাজে মুনাফা চিহ্নিতকরণ, লিজ হিসাবায়ন, ইমপেয়ারমেন্ট, ফেয়ার ভ্যালু পরিমাপসহ নানা জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ বইয়ের ফ্লো-চার্ট ও ধাপে ধাপে সমাধান পদ্ধতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, ফলে সময় বাঁচবে এবং ভুল হিসাবায়নের ঝুঁকি কমবে। এছাড়া বইটিতে অন্তর্ভুক্ত বাস্তব কোম্পানির উদাহরণ পেশাজীবীদের নিজের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতিতে সরাসরি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করে তুলবে। নিরীক্ষক (অডিটর), বিশ্লেষক ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শকদের জন্যও এটি একটি কার্যকর ডেস্ক-রেফারেন্স হতে পারে।

তাত্ত্বিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব প্রয়োগের ওপর জোর দেয়াই ‘আইএফআরএস অ্যাপ্লিকেশন’ বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি। ৬১টি অধ্যায়ে বিস্তৃত বিপুল পরিমাণ উদাহরণ, সমস্যা-সমাধান ও কেস স্টাডি একে শুধু একটি পাঠ্যবই নয়, বরং একটি ব্যবহারিক রেফারেন্স গাইডে পরিণত করেছে। যারা আইএফআরএসকে সত্যিকার অর্থে ‘বোঝা’র পাশাপাশি ‘প্রয়োগ’ করতে চান—শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা করপোরেট পেশাজীবী নির্বিশেষে—তাদের সংগ্রহে বইটি রাখা সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বইটি অনলাইন প্লাটফর্ম বাদেও স্থানীয় বইয়ের দোকান থেকে সংগ্রহ করা যাবে।

সুরঞ্জনা জামান: শিক্ষার্থী, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও