মানুষের অনেক সমস্যার মূলে আসলে লুকিয়ে আছে মানুষ নিজেই। মনোবিজ্ঞানে যাকে বলে সেলফ সাবোটেজ- নিজের অবচেতন প্রবৃত্তি আর ক্ষণস্থায়ী চাহিদার কাছে হার মানা। ওজন নিয়ন্ত্রণ করা, ঋণমুক্ত হওয়া, সুখী দাম্পত্য কিংবা অর্থবহ কর্মজীবন—সবকিছুতেই দরকার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের জন্য বর্তমানের ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে স্থগিত রাখা। কিন্তু সহজে কি সেটা সম্ভব?
এখানেই আসে মনোবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—ইভোলিউশনারি মিসম্যাচ বা বিবর্তনজনিত অসামঞ্জস্য। আমরা যে পরিবেশে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছি, আজকের পৃথিবী তার সঙ্গে মেলে না। আমাদের শরীর, মস্তিষ্ক আর প্রবৃত্তি মূলত শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের জন্য তৈরি হয়েছিল। আমাদের জিনগত গঠন প্রায় এক লক্ষ বছর ধরেই অপরিবর্তিত, কিন্তু এই সময়ে পৃথিবী বদলে গেছে বিস্ময়করভাবে। শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের জন্য তৈরি শরীর আর মস্তিষ্ককে হঠাৎ শহুরে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এই অমিলই আমাদের শারীরিক ও মানসিক অনেক সমস্যার মূল।
সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হলো আমাদের খাদ্যাভাস। একসময় লবণ, চর্বি আর চিনিযুক্ত খাবার পেলে আমরা হুড়মুড় করে খেতাম, কারণ পরের বেলার খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। আজ ক্যালোরি অঢেল, আর বিজ্ঞানীরা এমন সব খাবার বানাচ্ছেন যা প্রাকৃতিক কোনো খাবারের চেয়ে অনেক বেশি লোভনীয়। চিপস বা বিস্কুট একবার খাওয়া শুরু করলে থামানো দায়। একসময়ের বিরল স্থূলতা, আজ অপুষ্টিকেও ছাড়িয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শীর্ষে উঠে এসেছে।
প্রেম আর সঙ্গী খোঁজার প্রবৃত্তিও বদলে গেছে। ছোট উপজাতিতে সীমিত সঙ্গী থেকে জীবনসঙ্গী বেছে নেয়া ছিল সহজ সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন হাতে আছে এমন যন্ত্র, যা আমাদের হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় এক নিমেষে। ফলে সিদ্ধান্তহীনতা, আকস্মিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা বা ‘ঘোস্টিং’ বেড়েছে। মনোবিজ্ঞানে যাকে বলে চয়েস প্যারালাইসিস। সারাক্ষণই মনে হতে থাকে, আমার জন্য হয়েতো আরো ভালো কেউ অপেক্ষা করছে — যা মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।
শিকারি-সংগ্রাহক জীবনে প্রতিটি কাজে ছিল তাৎক্ষণিক আনন্দ—খাবার পাওয়া, আশ্রয় বানানো, দলবদ্ধ জীবনযাপন। আজ প্রযুক্তি আমাদের সেই অভিজ্ঞতাকে বিলাসিতা বানিয়ে ফেলেছে। অনেকেই একাকিত্বে ভোগে, কাজের অর্থ খুঁজে পায় না, জীবনে গভীর কোনো তাৎপর্য খুঁজে পায় না। আর মানসিক স্বাস্থ্যের এ পরিবর্তন আমাদের সামনে স্পষ্ট করে কীভাবে আমরা অসামাজিক হয়ে পড়ছি আর কাজের আনন্দ হারাচ্ছি।
এই শূন্যতা পূরণে আমরা আবার ফিরছি প্রযুক্তির দিকেই। প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন আমাদের জিভকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের মনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কেউ কেউ এদের সঙ্গে আবেগের বন্ধন গড়ে তুলছে, আবার কেউ ভুগছে বিভ্রমে। এ সম্পর্কের অগ্রগতিতে বিস্মিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও।
তবে কী এসব সমস্যার সমাধান অতীতে ফেরা? মোটেই না। প্রাচীন জীবনও ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। আসল বিষয় হলো বুঝতে পারা—আমাদের অনেক শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মূলে রয়েছে অসামঞ্জস্য। মানুষ নিখুঁত যন্ত্র নয় আর তাই ব্যর্থতা থাকবেই। শহুরে জীবনে একাকিত্ব, চাকরিতে শূন্যতা কিংবা ডায়েটের ব্যর্থতা—এসব ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং সময় আর জিনগত অমিলের প্রতিফলন। কারণ সমস্যাটা আমাদের ভেতরে নয়, সমস্যাটা সময়ের সঙ্গে।
সমাধান শুরু হতে পারে ছোট কিছু পদক্ষেপে—বাড়িতে জাঙ্ক ফুড না রাখা, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি, স্ক্রিন টাইম সীমিত করা। তবে বড় পরিবর্তনের জায়গা হলো— সামাজিকীকরণ, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানো।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে