মৃত্যুর পর মানুষ আপনাকে কীভাবে মনে রাখবে?

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেগেসি নিয়ে মানুষের এই তাড়নার পেছনে রয়েছে মৃত্যুর ভয়। নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির ফুকুয়া স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক কিম্বার্লি ওয়েড-বেনজোনি বলেন, মৃত্যুর চিন্তাই মূলত মানুষের মনে লেগেসি তৈরির প্রেরণা জোগায়। মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন সে উপলব্ধি করে যে সে আসলে হারিয়ে যেতে চায় না, বরং তার কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে চায়

মৃত্যুর পর মানুষ তার কাজের যে চিহ্ন বা প্রভাব রেখে যায়, সেটাই ‘লেগেসি’ বা উত্তরাধিকার। সাধারণত বয়োবৃদ্ধদের মধ্যেই উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার তাগিদ বেশি দেখা যায়।

উত্তরাধিকার বা ‘লেগেসি’ আসলে কী?

দুর্ভাগ্যবশত সিংহভাগ মানুষই বিষয়টি নিয়ে ভাবেন না। অথচ সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনভাবে, প্রতিটি মানুষই পৃথিবীতে নিজের কোনো না কোনো চিহ্ন বা উত্তরাধিকার রেখে যান। গবেষকরা মানুষের রেখে যাওয়া এ লেগেসিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন— জৈবিক, বস্তুগত ও মূল্যবোধগত উত্তরাধিকার।

মানুষের রেখে যাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তরাধিকার তার সন্তান-সন্ততি, যাদের মাধ্যমে তার জিনগত ধারা টিকে থাকে। তবে রক্তসম্পর্ক ছাড়াও জৈবিক উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া যায়। অনেকেই মৃত্যুর পর চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য বা মানবকল্যাণে নিজের অঙ্গ কিংবা সম্পূর্ণ দেহ দান করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২১ সালে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ মৃত্যুর পর বিজ্ঞান গবেষণার জন্য দেহদান করেছেন।

বেলজিয়ামে দেহদানে ইচ্ছুক ১০০ জন মানুষের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশেরই মূল অনুপ্রেরণা ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান রাখা। তবে মজার বিষয় হলো, ১৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন—জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দাতব্য কাজ, নিজের সম্পত্তির উইল কিংবা মূল্যবান কোনো পারিবারিক স্মারক রেখে যাওয়াকে বলা হয় বস্তুগত লেগেসি । কিন্তু মানুষ বস্তুগত সম্পদের চেয়ে তার চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের উত্তরাধিকার রেখে যেতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। মানুষ চায় তার দয়া, সততা ও জীবনবোধের গল্প বেঁচে থাকুক।

৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী একদল মানুষের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজেদের জীবনবোধ, নীতি ও পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা ডায়েরি বা আত্মজীবনী আকারে লিখে গেছেন, তারা জীবনের শেষভাগে মানসিক শান্তি পেয়েছেন। অতীতকে সহজে মেনে নেয়ার পাশাপাশি তাদের এ কাজ নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জুগিয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ‘লেগেসি মোটিভেশন’

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেগেসি নিয়ে মানুষের এই তাড়নার পেছনে রয়েছে মৃত্যুর ভয়। নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির ফুকুয়া স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক কিম্বার্লি ওয়েড-বেনজোনি বলেন, মৃত্যুর চিন্তাই মূলত মানুষের মনে লেগেসি তৈরির প্রেরণা জোগায়। মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন সে উপলব্ধি করে যে সে আসলে হারিয়ে যেতে চায় না, বরং তার কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে চায়।

নিউজিল্যান্ডের ওটাগো ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসি বেরিং বলেন, আমরা প্রত্যেকেই নিজেকে নিজের জীবনের গল্পের নায়ক মনে করি। আর আমরা চাই এই গল্পের শেষ শিক্ষা বা মূল বার্তাটি যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা ‘দর্শক’ মনে রাখে। এটি মূলত মানুষের ভালোবাসা পাওয়া ও অন্যদের স্মরণে থেকে যাওয়ার আদিম আকাঙ্ক্ষার সম্প্রসারণ।

তবে মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জীবনের শেষভাগে এসে নয়, বরং তরুণ বয়স থেকেই নিজের উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবা উচিত। সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুর পর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু রেখে যাওয়ার এ মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ মানুষের বর্তমান জীবনের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে ও বেঁচে থাকাকে আরো অর্থপূর্ণ করতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও