দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের শুরুতে একসময় যে উত্তেজনা, আকর্ষণ আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাস থাকে, ধীরে ধীরে তা বদলে যায় জীবনের বাস্তবতায়। সংসার, কাজ, সন্তান বা দায়িত্বের চাপে সম্পর্ক অনেক সময় স্থিতিশীল হলেও একঘেয়ে হয়ে ওঠে। অনেকে এ স্থিতিশীলতাকেই সম্পর্কের সফলতা ভাবেন। কিন্তু অনেক সময় সেই স্থিতিশীলতা থেকেই স্থবিরতার জন্ম নেয়। সম্পর্কের ভেতর ঢুকে পড়ে নিঃশব্দ ক্ষয়রোগ—যার নাম ‘রুমমেট সিনড্রোম’।
এটি সম্পর্কের এমন এক অবস্থা—যেখানে একসঙ্গে থাকা দুই সঙ্গী একই ঘরে থাকে, একই সংসারের সব দায়-দায়িত্ব সামলায়, অথচ পারস্পরিক ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা কিংবা আবেগের বন্ধন হারিয়ে ফেলে। সম্পর্ক তখন রোমান্সের জায়গা থেকে সরে গিয়ে নিছক সহাবস্থানে নেমে আসে।
কী করে বুঝবেন আপনিও রুমমেট সিনড্রোমে ভুগছেন কি না!
- রুমমেট সিনড্রোমে আক্রান্ত অনেক দম্পতি দেখতে গেলে সবসময় একসঙ্গে থাকেন। একসঙ্গে বাজারে যান, টিভি দেখেন, এমনকি প্রতিরাতে একই বিছানায় ঘুমান। বাইরে থেকে মনে হয়, তাদের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বাস্তবে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে মানসিক তৃপ্তি নেই। জীবনযাপনের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ বা সন্তান পালনের দায়িত্বের ভিড়ে তারা কেবল ‘সহাবস্থান’ করে চলেছেন।
- অনেকেই মনে করেন, প্রতিদিনের কথোপকথন মানেই যোগাযোগ রক্ষা হচ্ছে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব কথা ঘনিষ্ঠতার জন্ম দেয় না। রুমমেট সিনড্রোমে আক্রান্ত দম্পতিরা নিয়মিত কথা বলেন, তবে তা কেবলই প্রয়োজনীয় কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দরকার ‘ওপেননেস’ ও ‘সিনসিয়ারিটি’—অর্থাৎ, খোলামেলা ও আন্তরিক যোগাযোগ। যখন এ আন্তরিকতা হারিয়ে যায়, তখন সম্পর্ক থেকে হারিয়ে যায় মানসিক সংযোগও। সঙ্গী হয়ে ওঠেন কেবল গৃহস্থালির সহকর্মী। একসময় একে অপরের সঙ্গে নিজের আনন্দ, দুঃখ বা ভয় শেয়ার করার প্রয়োজন অনুভূতিও হারিয়ে যায়।
- দুই রুমমেটের সঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকার পার্থক্য মূলত ঘনিষ্ঠতায়। শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক ঘনিষ্ঠতা—এই তিনটি স্তম্ভের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে সম্পর্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, এ তিনটির যে কোন একটি দুর্বল হলে, বাকিগুলোও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। রুমমেট সিনড্রোমে আক্রান্ত দম্পতিরা হয়তো একই বিছানায় ঘুমান, কিন্তু স্পর্শে থাকে না কোনো উষ্ণতা। আলাপে থাকে না আন্তরিকতা, চাওয়ায় থাকে না আগ্রহ। সম্পর্ক তখন নিছক একটি রুটিনে পরিণত হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, অনেকেই এটিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু যদি দীর্ঘদিন তা অবহেলিত থাকে, তাহলে সেটি সম্পর্কের প্রাণশক্তিকে মেরে ফেলে। তবে রুমমেট সিনড্রোম মানেই সম্পর্কের মৃত্যু নয়, এটি ইন্টেনশনালিটি’র অভাব। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা—
- খোলামেলা কথা বলুন, অভিযোগ নয়-সঙ্গীর সঙ্গে অনুভূতি শেয়ার করুন।
- একসঙ্গে সময় কাটান, ফোন বা টিভি বন্ধ রেখে শুধু দুজন কথা বলুন।
- শারীরিক ঘনিষ্ঠতাকে গুরুত্ব দিন, একটি আলিঙ্গনও অনেক কিছু ফিরিয়ে আনতে পারে।
- ছোট ছোট যত্ন নিন, সঙ্গীর প্রশংসা করুন, তাকে সারপ্রাইজ দিন, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করুন।
- প্রয়োজনে থেরাপিস্টের সাহায্য নিন, অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্ককে সঠিক পথ দেখায়।
ফোবর্স অবলম্বনে