গবেষণা

মিটিংয়ের 'দুষ্টচক্রে' কমছে উৎপাদনশীলতা, ফলপ্রসূ করার ১০ কৌশল

প্রতি ১০ জন কর্মীর ৯ জনই মিটিং চলাকালে অমনোযোগী থাকেন। আর মিটিংয়ের মোট সময়ের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয় অপ্রাসঙ্গিক আলাপ-আলোচনায়।

কোন প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়, ততই বাড়তে থাকে সাপ্তাহিক মিটিংয়ের সংখ্যা। কর্মীদের মধ্যে সদ্ভাব, কাজের সমন্বয় ও সবাইকে একসঙ্গে জুড়ে রাখাই মিটিংয়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় মিটিং কর্মক্ষমতা কমায়, কর্মীদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

২০২৪ সালের ‘ফেলো স্টেট অব মিটিং’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীরা তাদের কর্মসপ্তাহের অন্তত ২০ শতাংশ সময় মিটিংয়ে ব্যয় করেন। সিনিয়র পদে এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। দীর্ঘমেয়াদে এ অকার্যকর সময় কোম্পানির জন্য বড় খরচে পরিণত হয়, বছরে যা প্রায় ২৫ হাজার ডলার।

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার এক গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন কর্মীর ৯ জনই মিটিং চলাকালে অমনোযোগী থাকেন। আর মিটিংয়ের মোট সময়ের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয় অপ্রাসঙ্গিক আলাপ-আলোচনায়।

মিটিং কি সবসময় প্রয়োজনীয়?

গবেষণা বলছে, অনেক মিটিংই কেবল ‘রুটিন ওয়ার্ক’। একই এজেন্ডা নিয়ে বারবার আলোচনা হয় কিন্তু বিষয়টি আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রাখে কিনা তা কেউ ভাবে না। অনেক ক্ষেত্রে আলোচ্য তথ্য ইমেইলে পাঠানোই যুক্তিযুক্ত। আর মিটিংয়ে তার ব্যাখ্যা বা প্রশ্নোত্তরের জন্য পাঁচ মিনিট রাখাই যথেষ্ট।

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার প্রফেসর রগেলবার্গের মতে, ফলপ্রসূ হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে পেছনে থাকবে অনলাইন মিটিং। ভিডিও বা কনফারেন্স কলে অংশগ্রহণকারীরা সহজেই আড়ালে চলে যায়। নেতা হয়ে যান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার। মজার বিষয় হলো, মানুষ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে রিমোট মিটিংকে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাকে পছন্দও করে।

ফলপ্রসূ মিটিংয়ের ১০ উপায়:

মিটিং পুরোপুরি বাদ দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এর সংখ্যা ও সময় কমিয়ে সঠিকভাবে পরিচালনা করলে কর্মীরা অনেক বেশি উৎপাদনশীল হতে পারেন।

  • হাঁটতে হাঁটতে মিটিং করুন: দুই-একজন অংশগ্রহণকারী থাকলে হাঁটতে হাঁটতে মিটিং খুবই কার্যকর। এতে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা যায়, মনও সতেজ থাকে।
  • সময়সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করুন: মিটিং এক ঘণ্টা করতে হবে এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। যতটুকু সময় প্রয়োজন মনে হয় তার থেকে ৫-১০ মিনিট কমিয়ে নির্ধারণ করুন। পার্কিনসনের আইন বলছে, কাজ বরাদ্দকৃত সময় অনুযায়ী লম্বা হয়। তাই ৩০ মিনিটের কাজকে ২০ মিনিটে সীমাবদ্ধ রাখলে কর্মীরা আরো মনোযোগী হন।
  • আগেই পরিষ্কার এজেন্ডা পাঠান: মিটিং কেন হচ্ছে, কী আলোচনা হবে, প্রত্যাশিত ফলাফল কী এগুলো আগেই জানানো জরুরি। সম্ভব হলে আগের দিন ইমেইলের মাধ্যমে প্রত্যেক কর্মীকে তা জানিয়ে দিন।
  • মিটিং পরবর্তী দায়িত্ব স্পষ্ট করে দিন: মিটিং শেষে কে কোন কাজ করবে, সময়সীমা কী হবে তা পরিষ্কারভাবে ভাগ করে দিলে মিটিংয়ের উদ্দেশ্য সফল হয়।
  • মিটিংয়ের পর প্রাসঙ্গিক তথ্য পাঠান: যে সব নোট, উপাত্ত বা ডকুমেন্ট দরকার হবে, সেগুলো অংশগ্রহণকারীদের পরে পাঠিয়ে দিন। এতে সবাই আলোচনায় মনোযোগ দিতে পারে।
  • স্ট্যাটাস আপডেট মিটিং বাতিল করুন: যে বিষয় ইমেইল, স্ল্যাক, টিমস বা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট টুলেই দেয়া যায়, সেটির জন্য মিটিং ডাকার প্রয়োজন নেই।
  • সময়মতো মিটিং শুরু করুন: দেরিতে উপস্থিত হওয়া কর্মীদের জন্য মিটিং থামাবেন না। আবার ১০-১৫ মিনিট পরে কাউকে ঢুকতেও দেবেন না। এতে সময়ের মূল্যায়ন হয়, সময়মতো যোগ দেয়ার ব্যাপারে কর্মীরাও অভ্যস্ত হয়।
  • মিটিং ছোট রাখুন: ছয় জনের বেশি অংশগ্রহণকারী হলে আলোচনায় মনোযোগ কমে, দায়িত্ব বণ্টন অস্পষ্ট হয়। প্রয়োজন নেই এমন কর্মীদের বাদ দিন। কারো অন্য কাজ অগ্রাধিকার পেলে, প্রয়োজনে তার বিকল্প খুঁজে নিন।
  • মিটিংকে আনন্দময় করুন: মিটিংকে কর্মীরা সাধারণত ‘ইন্টারাপশন’ বা বিঘ্ন হিসেবে দেখেন। তাই নেতার উচিত মিটিং রুমে উপস্থিত কর্মীদের স্বাগত জানানো, কৃতজ্ঞতা জানানো, পরিচয় করিয়ে দেয়া। হালকা রসিকতা ও আন্তরিকতায় মিটিং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
  • হোস্টের দায়িত্ব: হোস্ট হিসেবে নিশ্চিত করুন কেউ যেন আলোচনায় আধিপত্য বিস্তার না করে বা একই কথা বারবার বলা না হয়। প্রয়োজন হলে ব্রেইনস্টর্মিং বা প্রেজেন্টেশনের নতুন বিকল্পও ব্যবহার করা যেতে পারে। মিটিংয়ে সব আলোচনার দায়িত্ব নেতার নয়। কিছু এজেন্ডা দলের অন্য সদস্যকে উপস্থাপনা করতে দিন।

স্পষ্ট এজেন্ডা, সীমিত সময়, পরিষ্কার দায়িত্ব বণ্টন ও অপ্রয়োজনীয় আলোচনা কমানোর মাধ্যমে পুরো কর্মস্থল আরো কর্মমুখর হয়ে উঠতে পারে।

আরও