বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাড়ে ক্ষয় শুরু হয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হাড়ে ক্ষয় ঘটতে দেখা যায় তুলনামূলক বেশি। হাড়ের এ ক্ষয় ও ক্ষয়জনিত জটিলতার নিদান নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিয়মিত অনুসন্ধান চালাচ্ছেন অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞরা। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডভিত্তিক ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত এমনই এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বৃদ্ধা নারীদের হাড়ে এ ক্ষয়কে মোকাবেলা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে নিয়মিত চা-পান। আবার অতিরিক্ত কফিপানে দেখা দিতে পারে এর সম্পূর্ণ বিপরীত প্রভাব। খবর সায়েন্স ডেইলি।
নিয়মিত কফি বা চা পান করার সঙ্গে হাড়ের মধ্যে অবস্থিত খনিজ পদার্থের ঘনত্বে (বোন মিনারেল ডেনসিটি বা বিএমডি) পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, তা অনুসন্ধানে এ গবেষণা চালানো হয়। অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয়রোগের ঝুঁকি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান একটি সূচক হলো এ বিএমডি। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ১০ হাজার নারীর ওপর ১০ বছর ধরে চালানো পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার পাওয়া ফলাফল নিউট্রিয়েন্টস জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী পঞ্চাশোর্ধ নারীদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ভঙ্গুরতায় আক্রান্ত। এ অস্টিওপোরোসিসের প্রভাবে কারণেই প্রতিবছর দুনিয়াজুড়ে লাখ লাখ নারীর হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। যেহেতু সারা পৃথিবীতেই কফি ও চা পান কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, সে কারণে ওপর এসব পানীয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকেরা। এ নিয়ে আগে অনেক গবেষণা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এগুলোর ফলাফল ছিল পরস্পরবিরোধী। গবেষকদের দাবি, ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায়ই প্রথম এত বড় জনগোষ্ঠীকে পুরো এক দশক ধরে অনুসরণ করেছে।
গবেষণার আওতাধীনরা দশ বছর ধরে নিয়মিত নিজেদের কফি ও চা পানের পরিমাণ জানিয়েছেন। একই সময়ে উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ করেছেন গবেষকরা। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত চা-পান করেন, তাদের হিপ বিএমডি অন্যদের তুলনায় একটু বেশি হয়। এক্ষেত্রে ব্যবধান কম হলেও তা পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির কলেজ অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথের অ্যাডজাঙ্ক্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এনিউ লিউ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হাড়ের ঘনত্বে সামান্য উন্নতিও বিপুল সংখ্যক মানুষের হাড় ভাঙার সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে পারে।’
গবেষণায় চায়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেলেও মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে কফির ক্ষেত্রে। মাঝারি মাত্রায় বা দিনে প্রায় দুই থেকে তিন কাপ কফি পানের সঙ্গে হাড়ের ভঙ্গুরতার কোনো ক্ষতিকর সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে দিনে পাঁচ কাপের বেশি কফি পানকারীদের হাড়ে বিএমডি কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ থেকে বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত পাচ্ছেন অতিরিক্ত কফিপান হাড়ের শক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যেসব নারীর আজীবন অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা বেশি ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে কফির নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে স্থূলতাসম্পন্ন নারীদের মধ্যে চায়ের উপকারিতা বেশি স্পষ্ট ছিল।
গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক রায়ান লিউ বলেন, চায়ে ক্যাটেচিন নামে কিছু যৌগ থাকে, যা হাড় গঠনে সহায়তা করতে পারে এবং হাড়ক্ষয় ধীর করতে পারে। অন্যদিকে ল্যাবরেটরিতে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, কফিতে বিদ্যমান ক্যাফেইন হাড়ের ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের বিপাক প্রক্রিয়ায় সামান্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে কফিতে দুধ যোগ করলে এ প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।’
আর কলেজ অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথের অ্যাডজাঙ্ক্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এনিউ লিউ বলেন, ‘এ গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে প্রতিদিন চা পান করা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি সহজ সহায়ক সমাধান হতে পারে। আর কফির ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রায় পান করাটাই নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত কফি পানের প্রভাব ভালো না-ও হতে পারে, বিশেষ করে যেসব নারী অ্যালকোহল পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে। তবে তার মানে এই নয় যে আপনাকে কফি ছেড়ে দিতে হবে বা গ্যালন গ্যালন চা পান শুরু করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি এখনো হাড়ের স্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি। তবে আপনার কাপে কী আছে, সেটিও ভূমিকা রাখতে পারে। বৃদ্ধাদের জন্য প্রতিদিন এক কাপ চা শুধু স্বস্তির অভ্যাসই নয়, বরং হাড়কে শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে একটি ছোট পদক্ষেপ হতে পারে।’