সেভিয়র কমপ্লেক্স: আপনিও কি উদার হতে গিয়ে আত্মবিসর্জন দিচ্ছেন

সেভিয়র কমপ্লেক্স—এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে কেউ নিজের অবস্থা ও অবস্থানের তোয়াক্কা না করে অন্যকে সাহায্য করাকে দায়বদ্ধতা মনে করেন। অনেক সময় তারা মনে করেন, অন্যকে বাঁচানোই তাদের জীবনের মিশন। আর এজন্য নিজেদের তারা বিশেষ বা অনন্য ক্ষমতার অধিকারী বলে ভাবেন

মানুষকে সাহায্য করা নিঃসন্দেহে একটি মানবিক গুণ। উদার, সহযোগিতাপরায়ণ বা দয়ালু হওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু কখনো কখনো সাহায্য করার এ মানসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যখন মানুষ অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব, চাহিদা, অবস্থানকে উপেক্ষা করতে শুরু করে। তখন বিষয়টি আর কেবল ‘ভালো মানুষ’ হওয়ায় আটতে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে সেভিয়র কমপ্লেক্স।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ক্যাসান্দ্রা বোডাকের ভাষায়, সেভিয়র কমপ্লেক্স—এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে কেউ নিজের অবস্থা ও অবস্থানের তোয়াক্কা না করে অন্যকে সাহায্য করাকে দায়বদ্ধতা মনে করেন। অনেক সময় তারা মনে করেন, অন্যকে বাঁচানোই তাদের জীবনের মিশন। আর এজন্য নিজেদের তারা বিশেষ বা অনন্য কিছু ক্ষমতার অধিকারী বলে ভাবেন। একে অনেকে ‘মেসায়াহ কমপ্লেক্স’ বা ‘হোয়াইট নাইট সিনড্রোম’ নামেও চিহ্নিত করেন।

যদিও এটি কোনো রোগ নয়। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—এ আচরণগত প্রবণতা আবেগ, চিন্তা ও দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

কখন বুঝবেন, আপনার মধ্যেও সেভিয়র কমপ্লেক্স আছে?

সেভিয়র কমপ্লেক্স থাকা মানুষের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—

  • অন্যের সুখ-দুঃখকে নিজের দায় মনে করেন। সাহায্য করতে না পারলে নিজেকে মূল্যহীন মনে করেন।
  • ‘না’ বলতে পারেন না।
  • নিজের শক্তি, সময় ও আবেগের সীমা টানতে পারেন না। ব্যক্তিগত প্রয়োজন, বিশ্রাম বা স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন।
  • অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে বারবার ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন না।
  • উপকারভোগী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে রাগ বা ক্ষোভ অনুভব করেন।
  • নিজের আত্মমর্যাদা পুরোপুরি অন্যকে সাহায্য করার সক্ষমতার ওপর ছেড়ে ওদন।

মনোরোগ পরামর্শদাতা জিনা মারি গুয়ারিনো বলেন, অনেক সময় সেভিয়র কমপ্লেক্স থাকা মানুষরা অবসাদগ্রস্থ বা সমস্যাগ্রস্ত মানুষের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হন। কারণ তাদের মনে হয় এদের বাঁচানোই তাদের দায়িত্ব। সমস্যাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে না পারলে অস্থির হয়ে ওঠেন।

এ মানসিক অবস্থার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে শৈশবের অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখে। কোনো প্রিয়জনকে সাহায্য করতে না পারার অপরাধবোধ থেকে শুরু হয় শোক, ট্রমা। যা পরবর্তীতে সেভিয়র কমপ্লেক্সের জন্ম দেয়। এ ছাড়া আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, নিজের প্রতি অনাস্থা ও স্বীকৃতির প্রত্যাশা সেভিয়র কমপ্লেক্স তৈরি করে।

এ প্রবণতায় আক্রান্ত মানুষরা নিজেদের ভীষণভাবে সমালোচনা করেন। তাদের যত অর্জনই থাকুক না কেন, নিজের সাফল্য উদযাপন করতে পারেন না। নিজেদের মূল্যবান প্রমাণ করতে আরো কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। এ প্রবল আত্মসমালোচনা অনেক সময় ‘হাই-ফাংশনিং ডিপ্রেশন’-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে অতিরিক্ত চাপ, ক্ষোভ, ক্লান্তি, একাকিত্ব ও ব্যবহৃত হওয়ার অনুভূতি জন্ম নেয়।

কীভাবে বের হবেন এ চক্র থেকে?

  • প্রথম ধাপ হলো—নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কেন সবসময় অন্যের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিই? আমার উদ্দেশ্য কি? আমি কি নিজেকে প্রমাণ করতে চাই? নাকি ভয় পাই যে কেউ আমাকে প্রয়োজনীয় মনে করবে না?’
  • পরের ধাপ—নিজেকে গুরুত্ব দেয়া। নিজের আত্মসম্মান, নিজের ভালো লাগা, নিজের সুস্থতা এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে।
  • সীমানা টানতে শেখা, প্রয়োজনে ‘না’ বলতে জানা।
  • নিজের সময়, বিশ্রাম, শখ, স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত সময় নির্ধারণ করা। অন্যের প্রত্যাশা থেকে নয় বরং নিজের চাহিদার ভিত্তিতে জীবনের লক্ষ্য তৈরি করা।
  • সবশেষে—সবসময় নায়কের ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়, দরকারও নেই—এই কঠিন সত্যকে মেনে নিতে হবে। মানবিক সম্পর্ক তখনই সুস্থ হয়, যখন দু’পক্ষই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।

আরও