শীতে অতিরিক্ত চুল পড়া রোধের সহজ পদ্ধতি

যদি চুল হঠাৎ খুব বেশি পরিমাণে পড়তে শুরু করে, স্কাল্পে ব্যথা/লালচে ভাব/ফুসকুড়ি দেখা দেয়, বা কয়েক মাস ধরে চুল একইভাবে পড়তে থাকে, তখন অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

শীতের প্রথম হাওয়া ছুঁয়ে যেতেই আমরা টের পাই প্রকৃতির পরিবর্তন। শীতের সকালগুলোয় চুল আচড়াতে গিয়ে হঠাৎই মনে হয়, চিরুনির ফাঁকে যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি চুল আটকে আছে। গোসলের পরও আগের তুলনায় মেঝেতে বেশুমার চুল দেখে দুশ্চিন্তাই হয়। কিন্তু বিষয়টা কোনো রহস্য নয়। শীত আমাদের স্কাল্প, রক্তসঞ্চালন এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে ছোট ছোট কয়েকটি পরিবর্তন আনে—আর সেই পরিবর্তনগুলোই বাড়িয়ে দেয় চুল পড়ার প্রবণতা।

শীতে চুল পড়া বাড়ে কেন?

১. শুষ্ক বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়

শীতের ঠাণ্ডা বাতাসে আর্দ্রতা থাকে কম; ঘরের ভেতরে চুলা, হিটার বা ঠাণ্ডা বাতাস চুল ও স্কাল্পকে শুষ্ক করে দেয়। স্কাল্প যখন শুষ্ক হয়, তখন তা খুশকি-সদৃশ ফ্লেক তৈরি করে এবং চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যায়। পাশাপাশি চুলের ডগা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ফলে মনে হয় চুল ‘পড়ছে’।

২. চুলের প্রাকৃতিক বৃদ্ধিচক্রে মৌসুমি পরিবর্তন

চুল সব সময় কেবল বাড়তেই থাকে না। চুলের জীবনচক্র তিনটি ধাপে চলে। বৃদ্ধি, স্থিরতা, তারপর ঝরা। শীতকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বেশি চুল স্থিরতা বা টেলোজেন পর্যায়ে চলে যেতে পারে, যাকে অনেকেই 'সিজনাল শেডিং' বলে। তাই এই সময় চুল বেশি ঝরলেও সেটা খুবই সাধারণ বিষয়।

৩. রোদ কম পাওয়া রক্তসঞ্চালন হ্রাস

ঠাণ্ডায় আমাদের শরীরের বাইরের রক্তনালি কিছুটা সংকুচিত হয়। স্কাল্পে রক্তপ্রবাহ সামান্য কমে গেলে চুলের গোড়া ঠিকমতো পুষ্টি পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শীতে রোদ কম পাওয়ার ফলে ভিটামিন–ডি কমে যাওয়া। যা চুল পড়া অন্যতম কারণ।

৪. আমাদের ভুল অভ্যাসগুলো

শীতে অনেকেই গরম পানি দিয়ে মাথা ধুয়ে নেন, তোয়ালে দিয়ে অধিক শক্তি প্রয়োগ করে চুল মোছেন, ব্লো-ড্রায়ার বেশি ব্যবহার করেন। শীতে অনুষ্ঠানাদি বেশি হওয়ায় হেয়ার আয়রন, কালার বেশি ব্যবহার করেন। এসব মিলেই চুলের কিউটিকলকে দুর্বল করে। এর ওপর যোগ হয় শীতের ধুলো, ধোঁয়া ইত্যাদি যা স্কাল্পে জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি করে এবং চুল পড়া বৃদ্ধি করে।

এই চারটি কারণে শীত আমাদের চুলকে করে বাড়তি ভঙ্গুরতা আর ঝরেও বেশি। কিন্তু ভালো খবর হলো, সামান্য যত্নেই অবস্থা বদলে যায়।

দৈনন্দিন যত্ন

  • বারবার শ্যাম্পু না করে স্কাল্প তেলতেল হলে ২–৩ দিনে একবার, অন্যথায় সপ্তাহে ১–২ বার আলতো করে শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলতে হবে।
  • গরম পানি নয়, কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত গরম পানি স্কাল্পের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। ফলে চুল আরও শুষ্ক হয়।
  • চুল আঁচড়ানোর সময় ফাঁক–ফাঁক দাঁতের চিরুনি, প্রথমে ডগা থেকে জট ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে আচড়াতে হবে। অতিরিক্ত টাইট চুল বাঁধা এড়িয়ে চলুন।
  • বাইরে বের হলে নরম স্কার্ফ বা ক্যাপ দিয়ে চুল ঢেকে নিন। এতে বাইরের ধুলাবালি ও ঠাণ্ডা থেকে চুল সুরক্ষা পাবে।
  • চুলের শেষ প্রান্তে কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। এতে চুলের ডগা নরম থাকবে এবং ভেঙে যাওয়া রোধ করবে।
  • নারকেল, সরিষা, তিল বা দু–তিন ধরনের তেলের মিশ্রণ চুলে ব্যবহার করলে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তেল সামান্য গরম করে আঙুলের ডগায় বা তুলায় নিয়ে স্কাল্পে হালকা ম্যাসাজ করুন ৫–১০ মিনিট। তারপর ১০–২০ মিনিট তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে রাখুন। সম্ভব হলে তোয়ালের ওপর গরম পানির ভাব ব্যবহার করুন। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে, তেল দ্রুত শোষিত হয়।
  • মেথি সারারাত ভিজিয়ে রেখে পেস্ট বানান। চাইলে দই বা নারকেল তেল মেশাতে পারেন। এটি সপ্তাহে একদিন স্কাল্পে লাগিয়ে ৩০–৬০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
  • খুসকির প্রবণতা বা ভঙ্গুর চুলের জন্য সপ্তাহে একবার দই–মধু ও ডিমের প্যাক ব্যবহার করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবেও অনেক সময় চুল পড়ে। তাই প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান। এবং সাটিন/সিল্কের বালিশের কাভার ব্যবহার করুন।

ভিতর থেকে যত্ন

  • ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল—চুলের মূল উপাদান কেরাটিনের জন্য এই খাবারগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। খাদ্য তালিকায় এসব খাবার রাখুন।
  • মেয়েদের চুল পড়ার বড় কারণ অনেক সময় আয়রন–ঘাটতি। তাই আয়রন ও বি–১২ সমৃদ্ধ খাবার খান।
  • ভিটামিন ডি এর অভাবে চুল পড়ে। তাই শরীরে রোদ লাগান। রোদ পোহানো সম্ভব না হলে ভিটামিন ডি যুক্ত খাবার বা চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট খান।
  • শীতেও পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। শরীরের ভিতরকার আর্দ্রতা চুলে প্রতিফলিত হয়। তাই প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করুন।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি চুল হঠাৎ খুব বেশি পরিমাণে পড়তে শুরু করে, স্কাল্পে ব্যথা বা লালচে ভাব কিংবা ফুসকুড়ি দেখা দেয়, বা কয়েক মাস ধরে চুল একইভাবে পড়তে থাকে, তখন অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

শীত চুলকে দুর্বল করতে চায় না। সে শুধু একটু বেশি যত্ন, একটু বেশি সতর্কতা দাবি করে। কুসুম গরম পানি, উষ্ণ তেলের মালিশ, সাপ্তাহিক পুষ্টি-প্যাক, আর যত্ন এগুলো চালিয়ে গেলে, যে চুলগুলো শীতে ঝরে যায়, বসন্তে তারা আবার ফিরে আসে। আরো শক্ত, আরো উজ্জ্বল হয়ে।

আরও