পুরান ঢাকার সুর গলির বাতাসে মিশে আছে অদ্ভূত এক সুবাস। বিরিয়ানি, বাখরখানি বা কাচ্চির সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে ঢাকার নাম, তেমনি কিছু পানীয়ের নামও এ নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। পুরান ঢাকার বলতেই প্রথমে মনে আসে দিলবাহারের নাম। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চকবাজার, ইসলামপুর, নয়ারহাট কিংবা লালবাগের অলিগলিতে এ পানীয় শীতলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, কিন্তু দিলবাহার এখনো অটুট। বরং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখন এসেছে নতুন রূপ—দিলবাহার আজওয়া শরবত।
শতাব্দী পুরনো ইতিহাস
'দিলবাহার' গল্পের শুরু ১৯২২ সালে। হযরত আলাউদ্দিন নামে এক তরুণ উদ্যোক্তা পুরান ঢাকার চকবাজারে শুরু করেছিলেন এক ছোট্ট শরবতের দোকান। কাঠের ঠেলাগাড়ি, সুগন্ধী লেবু, গোলাপজল, রুহ আফজা আর কেওড়া পানি—এ ছিল তার হাতিয়ার। দোকানের নাম দিয়েছিলেন তার বন্ধু: ‘দিলবাহার’, ফারসি শব্দ, অর্থ— হৃদয় প্রফুল্লকারী বা আনন্দদায়ক।
এ শরবতের বিশেষত্ব ছিল উপাদানের ভারসাম্য। গোলাপজল ও রুহ আফজার নিখুঁত মিশ্রণের পানীয়টি না বেশি মিষ্টি, না বেশি ঘন। পুরান ঢাকার প্রতিটি রমজানে কিংবা গরমের প্রতিটি দুপুরে এক গ্লাস দিলবাহার মানেই ছিল প্রশান্তি।
স্বাদের রহস্য
দিলবাহারের শরবতের মূল রেসিপি আজও গোপন। পরিবারের বাইরে কেউ জানে না এর উপাদানের মিশ্রণের পরিমাণ। জানা যায়, এতে থাকে গোলাপজল, কেওড়া পানি, লেবুর রস, রুহ আফজা, সামান্য আমলকি আর বরফ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য স্বাদ।
নতুন যুগের সূচনা: দিলবাহার আজওয়া বাদাম শরবত
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিলবাহারও নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। ২০২০ সালে বাজারে আসে দিলবাহার আজওয়া বাদাম শরবত—যেখানে মদিনার বিখ্যাত আজওয়া খেজুরের নির্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয় গোলাপজল, লেবুর রস, বাদাম ও সামান্য কেওড়া পানি। এ পানীয় শরীরে যেমন শীতলতা এনে দেয়, তেমনি খেজুরের প্রাকৃতিক পুষ্টি শক্তি যোগায়।
আজওয়া শরবতের অভিজ্ঞতা
আজওয়া শরবত মুখে তুললেই প্রথমে টের পাওয়া যায় খেজুরের ঘন মিষ্টতা, তারপর গোলাপজলের সুবাসে ভেসে আসে এক হালকা শীতলতা। বরফে ঠান্ডা পানীয়টি পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে মদিনার মরুভূমিতে এক গ্লাস প্রশান্তি।
রমজান মাসে চকবাজারের দোকানে এ শরবতের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। কেউ বোতলভর্তি করে বাড়িতে নেয়, কেউ আবার লাইনে দাঁড়িয়ে গ্লাস হাতে শরবত খায় পুরান ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে। বিয়ের দাওয়াত, ইফতার, ঈদ কিংবা অতিথি আপ্যায়নে দিলবাহার শরবত অপরিহার্য। আর আজওয়া শরবতের আবির্ভাব এ ঐতিহ্যে যুক্ত করেছে ধর্মীয় অনুরাগ ও পুষ্টির ছোঁয়া।