প্রবাসের ঈদে শেফ ইসমাইল আজও খোঁজেন রাজশাহীর শৈশব

‘মাস্টারশেফ: দ্য প্রফেশনালস’-এর সেমিফাইনালে ‘বিফ রিব ভুনা’ ও ‘হালিম’ পরিবেশন করে বিশ্বমঞ্চে খাঁটি বাংলাদেশী স্বাদ তুলে ধরেছিলেন শেফ ইসমাইল হোসেন।

তার রান্নার গল্প শুধু পেশাগত সাফল্যের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়ের রান্না, শৈশবের ঈদ, মাটির চুলার ঘ্রাণ আর প্রবাসজীবনের একাকিত্ব। লন্ডনে হেড শেফ হিসেবে কাজ করলেও খাবারের ভেতর তিনি আজও খুঁজে ফেরেন রাজশাহীর বাড়ি, পরিবারের উষ্ণতা আর মায়ের হাতের সেই অতুলনীয় স্বাদ। বণিক বার্তার হয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন নাসিব আহসান।

শৈশবের ঈদের কথা মনে পড়লে কোন খাবারের স্বাদটা সবচেয়ে আগে ফিরে আসে?

আসলে আমরা তো বাঙালি, তাই নির্দিষ্ট করে একটা খাবারের নাম বলা খুব কঠিন। বলতে পারেন, আমার মায়ের হাতের প্রতিটি রান্নাই একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে। ঈদের সকালে মায়ের হাতের চটপটি, লুচি-মাংস আর হরেক রকম মিষ্টি-পায়েস ছিল আমাদের সকালের নাশতা। এরপর দুপুরে গরু বা ছাগলের মাংস, মুরগির রোস্ট আর পোলাও কিংবা বিরিয়ানি। এই প্রতিটি খাবারই আমাকে শৈশবের ঈদে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

চাঁদরাত আর পরিবারকে ঘিরে ছোটবেলার ঈদের প্রস্তুতির স্মৃতিগুলো কেমন ছিল?

ঈদের আনন্দ আসলে শুধু ঈদের দিনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চাঁদরাতের আগ থেকেই কেনাকাটা, ঈদের দিন কোন জামাটা পরব—এসব নিয়েই আনন্দের সময় কাটত। ঈদের আগের রাতে ঢাকা থেকে কাজিনরা রাজশাহীর বাসায় আসত। তাদের সঙ্গে বাইরে থেকে আতশবাজি কিনে আনতাম। এরপর পরিবারের সবার সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেগুলো ফোটানোর আনন্দই ছিল অন্যরকম।

ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজিনদের সঙ্গে নামাজ পড়তে যাওয়া, ফিরে এসে কোলাকুলি, খাওয়া-দাওয়া আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ‘সালামি’ আদায় করা। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া আর ফিরে এসে আবার খাওয়া—এসব স্মৃতি আজ খুব মিস করি।

কোরবানির ঈদে ছোটবেলায় আপনার ভূমিকা বা অভিজ্ঞতা কী ছিল?

কোরবানির ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবার সঙ্গে গরু-ছাগল গোসল করাতে যেতাম। নামাজ থেকে ফিরে সবাই মিলে কোরবানি দেওয়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ছোট ছিলাম বলে বড় কোনো কাজ করতে পারতাম না, তবে ‘এটা লাগবে, ওটা লাগবে’ বলে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। শখের বশে হয়তো পাঁচ-দশ মিনিট মাংস কাটতেও বসতাম! সবকিছু শেষ হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুদের বাসায় মাংস বিলি করতে যাওয়ার যে আনন্দ ছিল, সেটা এখন খুব মিস করি।

ছোটবেলার ঈদ আর প্রবাসের ঈদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?

পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। ছোটবেলায় মাথায় কোনো টেনশন বা দায়িত্ববোধ ছিল না। শুধু আনন্দ করাটাই ছিল একমাত্র কাজ। আর এখন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে। ছোটবেলার সেই সারল্য এখন আর নেই, জীবন অনেক ব্যস্ত হয়ে গেছে। প্রবাসে, বিশেষ করে একটি রেস্টুরেন্টের দায়িত্বে থাকলে ঈদের দিন ছুটি পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। এমনও হয়েছে, সকালে ঈদের নামাজ পড়েই সরাসরি রেস্টুরেন্টের কাজে চলে গেছি। বন্ধুরা সবাই এখানে ব্যস্ত। শত চেষ্টা করলেও শৈশবের সেই ঈদ এখানে কিছুতেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

পরিবার ছাড়া বিদেশে ঈদ কাটানো কতটা কঠিন?

বিদেশের ঈদ একেক বয়সের মানুষের কাছে একেক রকম। যারা নতুন এসেছে, পরিবার নেই, তারা হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে রান্না করে, নামাজ পড়ে ঘুরতে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের হলো বাবা-মাকে ছাড়া ঈদ করা।

যখন সিঙ্গেল ছিলাম, তখন ঈদের দিন ছুটি নিতাম না। কারণ ছুটি নিয়ে বাসায় একা বসে থাকলে খুব মন খারাপ হতো। তাই মন খারাপ কাটানোর জন্য ইচ্ছে করেই নিজেকে কাজের ভেতর ব্যস্ত রাখতাম। তবে এখন আমার স্ত্রী আছে, এক বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে আছে। তাই এখন ঈদের দিনটা ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করি, নিজে রান্না করি এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাই।

বিদেশে থেকেও বাংলাদেশী খাবারের আসল স্বাদ ধরে রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

বেশ চ্যালেঞ্জিং। লন্ডনে বাংলাদেশী সব উপকরণ পাওয়া গেলেও দেশের সেই আসল স্বাদটা পাওয়া যায় না। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়ি থেকে খাঁটি মশলা, হলুদ, মরিচ, জিরা আসত—সবকিছুর স্বাদই ছিল একেবারে বিশুদ্ধ। সেই স্বাদ পেতে অনেক সময় আমাকে রেসিপি পরিবর্তন বা সমন্বয় করে রান্না করতে হয়।

মায়ের হাতের স্বাদ তো কখনোই হবে না, তবে আমি যতটা কাছাকাছি যাওয়া যায় সেই চেষ্টা করি। আমরা বিদেশে যারা বাংলাদেশী খাবার বানাই, তারা খাবারটাকে শুধু ‘উন্নত’ নয়, বরং ‘খাঁটি’ বা অথেনটিক রাখার চেষ্টা করি। আরেকটি বড় পার্থক্য হলো মাটির চুলা। রাজশাহীতে আমার নানাদাদি বা আমাদের বাড়িতে আম্মা যে মাটির চুলায় আস্তে আস্তে মাংস কষিয়ে রান্না করতেন, সেই ধোঁয়াটে ফ্লেভার প্রেশার কুকারে কখনোই আসবে না। এখন অনেকেই বারবিকিউ করে শৈশবের সেই চারকোল বা মাটির চুলার ফ্লেভার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। সবাই আসলে নিজের শেকড়ের স্বাদটাই খুঁজে ফেরে।

আপনার সন্তানকে বাংলাদেশের শেকড়ের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত রাখতে চান?

আমি যেভাবে একটি যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, আমার মেয়ে হয়তো সেই সুযোগটা পাবে না। তবে আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ছোটবেলার গল্প করি। আমার ইচ্ছে আছে, মেয়ে একটু বড় হলে দেশে গিয়ে পুরো পরিবার ও কাজিনদের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ করার।

আর সবচেয়ে বড় যে চেষ্টাটা আমি করি, তা হলো খাবারের মাধ্যমে তাকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা। আমার মা আমাকে যেসব খাবার রান্না করে দিতেন, যেসব স্বাদ এখনো আমার জিভে লেগে আছে—যেমন বিরিয়ানি, হালিম বা চটপটি—আমি চেষ্টা করি সেগুলো মেয়ের জন্য রান্না করতে।

আমি চাই, খাবারের মধ্য দিয়েই সে বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে বুঝুক এবং জানুক কেন আমি আমার দেশ ও পরিবারকে এত ভালোবাসি। পাশাপাশি প্রতিদিন ফেসটাইম বা ভিডিও কলে দাদা-দাদির সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমেও সে আমাদের শেকড়ের সঙ্গেই বেড়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

আরও