‘টল পপি সিনড্রোম’: অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি

এটি সাধারণ ঈর্ষা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক ‘ছাঁটাই’। মানুষ সাধারণত তাদের চেয়ে ভালো করা কাউকে দেখে অস্বস্তি বোধ করে। নিজেরা স্বস্তি পেতে অন্যের সাফল্যকে হেয় করার চেষ্টা করে। এ প্রবণতা আসে ‘নিজে পিছিয়ে পড়ার ভয়’ ও ‘তুলনায় ব্যর্থ হওয়ার আতঙ্ক’ থেকে

আপনি কি কখনও ভালো কাজ করার পরও নিজেকে খারাপ বা অপরাধী মনে করতে বাধ্য হয়েছেন? সফল হওয়ার পর অযাচিত কারণে আশপাশের মানুষরা আপনার কঠোর সমালোচনা করেছে কিংবা আপনাকে টেনে নামাতে চেয়েছে? যেদি তাই হয় তাহলে আপনি ‘টল পপি সিনড্রোম’ এর ভুক্তভুগী।

ব্রিটিশ লাইসেন্সড মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলর ইলিয়ানা বোনাগুরো বলেন, এটি সাধারণ ঈর্ষা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক ‘ছাঁটাই’। মানুষ সাধারণত তাদের চেয়ে ভালো করা কাউকে দেখে অস্বস্তি বোধ করে। নিজেরা স্বস্তি পেতে অন্যের সাফল্যকে হেয় করার চেষ্টা করে। এ প্রবণতা আসে ‘নিজে পিছিয়ে পড়ার ভয়’ ও ‘তুলনায় ব্যর্থ হওয়ার আতঙ্ক’ থেকে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এটি ক্যানসেল কালচার, হাম্বলব্র্যাগ শেমিং, বা হেটারস নামে পরিচিত।

প্রাচীন রোমের গল্প

ধারণাটির শিকড় প্রাচীন রোমে। স্বৈরশাসক রাজা টারকুইন দ্য প্রাউড প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর যেসব নাগরিক তার নিয়ন্ত্রণ মানতে চাইত না, তাদের সরিয়ে দিতে ছেলের প্রতি গোপন নির্দেশ দেন। এ ইচ্ছার প্রতীক হিসেবে তিনি নিজের বাগানের সবচেয়ে উঁচু পপি ফুলগুলোর মাথা কেটে দেন। সেখান থেকেই এসেছে এ রূপক শব্দ ‘টল পপি সিনড্রোম’।

কোথায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়?

কর্মক্ষেত্র, বন্ধুত্ব, পরিবার, ও অনলাইন পরিবেশে — এ চারটি জায়গায় টল পপি সিনড্রোম সাধারণত বেশি দেখা যায় ।

১. কর্মক্ষেত্রে: সফল ব্যক্তিকে নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে একরকম অস্বস্তি থাকে। তারা ধরেই নেয় যে সফল ব্যক্তিটি নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের অনিরাপত্তার কারণে তাদের প্রাপ্য পদোন্নতিও এড়িয়ে যেতে পারেন।

২. বন্ধুত্বে: বন্ধুরা কখনও ব্যাকহ্যান্ডেড কমপ্লিমেন্ট দেয়। সেটি বাহ্যত প্রশংসা হলেও ভেতরে খোঁচা। অথবা আপনার সাফল্যকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে অন্যদের সাফল্য বেশি উদযাপন করা।

৩. পরিবারে: অনেক সময় পরিবারের মধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভুত হয়। তাকে গ্রুপ চ্যাটে রাখা হয় না, সিদ্ধান্ত থেকে রাখা হয় দূরে, কিংবা ধরে নেয়া হয় সে হয়তো অংশ নিতে চায় না।

৪. অনলাইন স্পেসে: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি আরো কঠিন। পরিচয়হীনতা মানুষকে নির্দয় করে তোলে। আপনি এমন লোকের কাছ থেকেও আক্রমণ বা কটূক্তি পেতে পারেন, যাদের আপনি চেনেনই না।

এর মূল কারণ—নিজেদের অযোগ্যতার অনুভূতি। অন্যের সাফল্যকে ছোট করে দেখাতে পারলে মূলত তারা নিজেরাই কম হীনমন্য বোধ করে। টল পপি সিনড্রোম মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এতে মানুষের একাগ্রতা, পরিশ্রমসহ অন্যান্য গুণগুলো উপেক্ষিত হয়। ফলে সে উদ্বিগ্ন, একাকী বোধ করতে পারে, এমনকি নিজের প্রতিভা অপ্রকাশিত রাখার চেষ্টা পর্যন্ত করতে পারে।

কীভাবে সামাল দেবেন

টল পপি সিনড্রোমের মুখোমুখি হলে—

১. প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলুন, ভাবনাগুলো শেয়ার করলে মানসিক চাপ কমে। গবেষণা বলছে, সামাজিক সমর্থন ইতিবাচক আবেগ বাড়ায় এবং স্ট্রেস কমায়।

২. নিজেকে সমর্থন করুন। যে আপনার সাফল্যকে ছোট করে দেখে তাকে এড়িয়ে চলুন।

৩. পেশাদারত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ স্পষ্ট করুন। এতে আপনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার থাকার পাশাপাশি আত্মমর্যাদা বজায় থাকবে।

৪. নিজের আচরণ নিয়ে ভাবুন। মুহূর্তের উত্তেজনায় সবাই ভুল করে। কোন অবস্থায় কীভাবে আরও ভালোভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো যেত তা ভেবে রাখা ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক।

আরও