সন্তানের আগমন কী দাম্পত্যে দূরত্ব তৈরি করে?

ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর আজীবন একসঙ্গে চলার একরাশ স্বপ্ন নিয়ে মানুষ বৈবাহিক জীবন শুরু করে। তবে জীবনের পথচলায় কিছু পরিবর্তন আসে, যা সুন্দর সাজানো দাম্পত্যে ছন্দপতন ঘটায়। সন্তানের আগমন যে কোনো দম্পতির কাছে পরম আনন্দের ও আবেগের বিষয় হলেও, অনেক সময় এ নতুন অতিথির আগমনই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। অজান্তেই তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব।

মনোবিদদের ভাষায়, ‘সন্তানের জন্মের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চেয়ে ‘বাবা-মা’ পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে।’ বিশেষ করে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সন্তানের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে দম্পতিরা নিজেদের সম্পর্কের যত্নে অবহেলা শুরু করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দূরত্ব অসহনীয় হওয়ার আগে তারা টেরও পান না যে তারা একে অপরের থেকে কতটা দূরে সরে গেছেন।

দূরত্ব কেন তৈরি হয়?

দাম্পত্যে দূরত্ব কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  • স্বামী হয়তো পরিবার সামলাতে গিয়ে আর্থিক চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, অন্যদিকে স্ত্রী সন্তানের পেছনে সব সময় ও শক্তি ব্যয় করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
  • সন্তান জন্মের পর নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ও ‘পোস্ট পার্টাম ব্লুজ’ সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।
  • অনেক সময় মা একাই সব দায়িত্ব পালন করেন। এ ভারসাম্যহীনতা স্ত্রীর মনে বিরক্তি ও ক্ষোভ তৈরি করে।
  • ক্লান্তি ও শরীরের পরিবর্তনের কারণে ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া ভুল বোঝাবুঝির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অভিমানের গভীরতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া

আর্থিক স্থিতিশীলতাই একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য যথেষ্ট নয়। পারস্পরিক বোঝাপড়া এ কঠিন পরিস্থিতি কাটানোর মূল চাবিকাঠি। স্বামী যেমন পরিবারের খরচ জোগাচ্ছেন, তাকে তেমনি স্ত্রীর মানসিক চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আবার স্ত্রীকেও বুঝতে হবে স্বামী পরিবারের জন্য কতটা মানসিক চাপ নিচ্ছেন। একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সম্পর্ক রঙিন রাখার মূল মন্ত্র

সন্তান জন্মের পর সম্পর্ককে আগের মতো প্রাণোচ্ছল করতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি:

  • দায়িত্ব ভাগাভাগি: সন্তানকে বড় করা কেবল মায়ের একার কাজ নয়। রাত জাগা থেকে শুরু করে টুকিটুকি কাজে বাবা এগিয়ে এলে দাম্পত্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
  • প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা: স্ত্রী বা স্বামী—একে অপরের ছোট ছোট কাজের প্রশংসা করুন। ‘আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ’—সহজ কথাটি সম্পর্কে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
  • একান্তে সময় কাটানো: সপ্তাহে অন্তত এক দিন ‘ডেট’ ফিক্স করুন। সন্তানের বাইরে নিজেদের অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন। সিনেমা দেখা বা হাঁটতে যাওয়ার মতো ছোট ছোট কাজগুলো সম্পর্কের জড়তা কাটায়।
  • স্পর্শ ও রোম্যান্স: দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রোম্যান্সকে হারিয়ে যেতে দেবেন না। ছোটখাটো সারপ্রাইজ বা স্পর্শ সঙ্গীর মন ভালো করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কখন প্রয়োজন?

যখন প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক অনেক বেড়ে যায়, তখন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ।"মনোবিজ্ঞানীরা অনেক সময় দম্পতিদের আলাদা ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ দেন যা সম্পন্ন করতে পরস্পরের প্রতি গভীর বোঝাপড়া প্রয়োজন হয়।" থেরাপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দম্পতিরা তাদের পুরনো প্রেম ও বোঝাপড়া নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন।

আরও