মানব জীবন এক প্রকার ভ্রমণ। এ ভ্রমণ অনেকটা ট্রেনে চেপে দূর গন্তব্যে যাবার মতো। একেকটা বয়সের যেমন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকে, তেমনি ট্রেনের বগি ও কামরাগুলোও হরেক রকমের হয়। এসব কামরায় নানা রঙের মানুষ কিছুক্ষণ ঠাঁই নেয়। তবু এ অল্প সময়ের যাত্রা নানা কারণে হয়ে উঠতে পারে ঘটনাবহুল। এরই সাবলীল উপস্থাপন করেছেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসে।
যাত্রাপথে অসংখ্য অপরিচিত মুখের দেখা মেলে। সবাই শেষ গন্তব্য পর্যন্ত সঙ্গে থাকে না, কিংবা কেউই থাকে না। কিছুক্ষণ সঙ্গে থেকে কিছুদূর এগিয়ে যে যার গন্তব্যে পাড়ি জমায়। কিন্তু কিছুদূর যেতে যেতে তৈরি হয় নানা গল্প, জানা হয় অনেক অজানাকে। কখনো বিস্মিত হতে হয়, কখনো বিরক্তও।
উপন্যাসটির অন্যতম চরিত্র চিত্রার অবশ্য ট্রেন যাত্রা শুরু আগেই বিরক্ত বোধ হচ্ছিল একজন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে একই কামরায় বসে যেতে হবে ভেবে। যদিও সেই ব্যক্তি কোনো সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন পৃথিবীর শীর্ষ দশ গণিতবীদদের একজন। নাম আব্দুর রশিদ উদ্দিন। তারপরও কিছু কারণবশত চিত্রা সেই ব্যক্তির সঙ্গে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে না। তাকে সেই বিপত্তি থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে অন্য কামরার এক সহযাত্রী। পেশায় ডাক্তার সেই সহযাত্রী (আশহাব) তার মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। তিনি চিত্রাকে তার মায়ের কামরায় থাকার প্রস্তাব দেন। চিত্রা সানন্দে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে। কিন্তু তখনও সে জানত না, এবার বিরক্তি নয়, মহাবিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে সে। চিত্রা কেন, কারো পক্ষেই নিশ্চয় অনুমান করা সম্ভব নয় যে কিছুক্ষণের ব্যবধানে একজন মা অপরিচিত এক মেয়েকে পুত্রবধু বানিয়ে ফেলতে পারে!
উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে চিত্রার অস্বস্তির মধ্য দিয়েই। তারপর একের পর এক চরিত্র যোগ হয়েছে- আব্দুর রশিদ উদ্দিন, আশহাব ও তার মা, মওলানা ও তার বউ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার পরিবার। উপন্যাসটি ট্রেনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে গেছে।
শুরুতেই বলেছিলাম জীবন একটা ভ্রমণ। জীবনের ভ্রমণে নানা বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। তেমনিভাবে উপন্যাসটি পড়েও সমাজের কিছু চিরাচরিত সত্যের স্বাদ পাওয়া যায়। প্রচলিত আছে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো পরিচিত মামা-চাচা চাকরিরত থাকলে নাকি অনেক মুশকিল আসান হয়ে যায়। উপন্যাসে এ বয়ানের যেন বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে। চিত্রার বান্ধবী লিলি তার মামার পেশাগত ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে চিত্রার জন্য টু সিটার স্লিপার কামরার টিকিট করা হয়, যেখানে অন্য যাত্রী ওঠার কথা ছিল না। কিন্তু ঘটনাক্রমে সেখানে একজন বয়োজেষ্ঠ্য উঠে যান। তবে তিনি কোনো সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। তবে ট্রেনের টিকিট কাটায় নয়, বাস্তবতার আসল রূপ দেখা মেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল খায়ের খান ও তার পরিবারের চরিত্রে। ক্ষমতার অপব্যহারকারী একজন মন্ত্রীর জীবন যাপনের মূল আধার হলো ক্ষমতা। ক্ষমতা ছাড়া তিনি সমাজের আর পাঁচজন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মতো এবং ক্ষেত্র বিশেষে খুবই অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাকে। সেই পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন ট্রেনের সবাই খবর পেয়ে যায় আবুল খায়ের খানের মন্ত্রীত্ব খোয়া গেছে। অন্যদিকে, সুন্দরী চিত্রাকে দেখে আশহাবের মা সাজেদা বেগমের ভাষ্যে সমাজে একজন নারীকে ‘বউ’ হতে কোন কোন বিচারে উত্তীর্ণ হতে হয় সেদিকটাও সরলভাবে উপস্থাপন হয়েছে।
সেই সঙ্গে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়টিও অত্যন্ত হাস্যরসাত্মকভাবে লেখক উপন্যাসে ব্যক্ত করেছেন। ট্রেনের ভেতরেই মওলানার স্ত্রী আফিয়ার প্রসব ব্যথা শুরু হয়ে যায়। হতভম্ব মাওলানা ট্রেনে একজন মহিলা ডাক্তারকে খুঁজতে থাকে, কিন্তু পুরো ট্রেনে কোনো মহিলা ডাক্তার ছিলেন না। চিত্রা ও রশিদ সাহেব মাওলানাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সেখানে কেবল একজন ডাক্তারই আছেন। তিনি হলেন আশহাব। কিন্তু মাওলানা কোনো অবস্থাতেই তার স্ত্রীকে পুরুষ ডাক্তার দেখাতে রাজি হন না। কিন্তু আফিয়ার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে...। এমন সময় ট্রেনও এক গহীন জঙ্গলের ভেতর হঠাৎ থেমে যায়।
কোনো যাত্রী এক স্টেশনে নেমে গেলে তার কাছে যেমন অন্য যাত্রীর আর খোঁজ থাকে না, তেমনি উপন্যাসটি পড়ে ট্রেন চলার পর কী হয়েছিল, আফিয়া কি বেঁচে ছিলেন, চিত্রা আর আশহাবের কি প্রেম হয়েছিল, সাজেদা বেগম কি ঠাহর করতে পেরেছিলেন তিনি কি করছেন, মন্ত্রী পরবর্তী সময়ে কী অনুশোচনায় ভুগে শুধরে নিয়েছিলেন নিজেকে, মওলানা কি ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী বুঝেছিলেন- এসবের কিছু পাঠকও জানতে পারে না। তাই পড়া শেষে বইটি বন্ধ করলে মনে হতে পারে ‘কিছুক্ষণ’ সেই ট্রেনে পাঠক নিজেও ছিলেন, পৌঁছে গেছেন কোনো এক আবেশমাখা অনুভূতির স্টেশনে।