অতিরিক্ত কাজের চাপ, উদ্বেগ কিংবা আর্থিক টানাপড়েন—প্রাত্যহিক জীবনের যান্ত্রিকতায় মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন অত্যন্ত কার্যকর সমাধান উষ্ণ আলিঙ্গন বা ‘হাগ’। আপাতদৃষ্টিতে আলিঙ্গন ঋণের বোঝা কমায় না বা ভাঙা সম্পর্ক জোড়া দেয় না। তবে বিজ্ঞান বলছে, মানুষের স্পর্শ কেবল আবেগীয় প্রশান্তিই দেয় না, এটি শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের শক্তিশালী প্রতিষেধক।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষ যখন তার প্রিয় কোনো মানুষকে জড়িয়ে ধরে, তখন মস্তিষ্ক থেকে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়। গবেষকরা একে বলেন ‘লাভ হরমোন’ বা ‘বন্ডিং হরমোন’। এ হরমোন শরীরে প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
অক্সিটোসিন নিঃসরণের ফলে রক্তে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কমে যায়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা উপশম হয়, অনিদ্রা দূর হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। ২০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময়ের একটি গভীর আলিঙ্গন শরীরের স্নায়ুগুলোকে শান্ত করে মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করতে পারে।
করোনাকালীন লকডাউনের পর থেকে ‘একাকীত্বের মহামারী’ প্রকট আকার ধারণ করেছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এখন ভিডিও কল বা খুদে বার্তায় বন্দি। আক্ষরিক অর্থেই আমরা শারীরিক স্পর্শবর্জিত জীবন কাটাচ্ছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের স্পর্শবর্জিত জীবন একাকীত্ব ও বিষণ্ণতাকে বাড়িয়ে তোলে। একজন মানুষ যখন তার মা-বাবা, জীবনসঙ্গী, সন্তান বা প্রিয় বন্ধুকে জড়িয়ে ধরেন, তখন তিনি এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তা অনুভব করেন। এ নিরাপত্তা বোধ তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার শক্তি জোগায়।
ফিলাডেলফিয়ার কাডল থেরাপিস্ট জান্ড্রিয়া শেফারের মতে, আলিঙ্গন কেবল মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রিয়জনের সান্নিধ্য ও স্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এছাড়া এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। একটি উষ্ণ আলিঙ্গন শরীরে শ্বেত রক্তকণিকার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা আমাদের বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
বর্তমানের নিঃসঙ্গতার যুগে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘কাডল থেরাপি’ বা পেশাদার আলিঙ্গন সেবা। এটি এমন এক পেশাদার সেবা, যেখানে সম্পূর্ণ অ-যৌন এবং নিরাপদ পরিবেশে স্পর্শের চাহিদা পূরণ করা হয়। এখানে প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টরা গ্রাহকের সম্মতি ও নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে হাত ধরা, আলিঙ্গন করা বা পাশে বসে থাকার মতো সেবা দেন। এটি মূলত স্পর্শবঞ্চিত মানুষের জন্য এক ধরনের নিরাময় প্রক্রিয়া।