“স্নো ফ্লাওয়ার অ্যান্ড দ্য সিক্রেট ফ্যান” উপন্যাসটি পড়তে গেলে মনে হবে এটি বন্ধুত্বের গল্প। কিন্তু পাঠের পরপরই মনে হতে শুরু করবে এটি কেবল একটি বন্ধুত্বের কাহিনি নয়। গল্পটিকে দেখা যায় একটি সভ্যতার কাঠামোর পুনর্গঠন হিসেবে। উপন্যাসের লেখক লিসা সি উনিশ শতকের হুনান প্রদেশের গ্রামীণ সমাজকে তুলে এনেছেন তার উপন্যাসে। তিনি এমন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, যেখানে নারীজীবন একই সঙ্গে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য। বিষয়টি ঘরেও যেমন, ক্ষমতার কেন্দ্রেও তেমন। লিলি ও স্নো ফ্লাওয়ারের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে উপন্যাসটির গল্প আবর্তিত। তবে সেই গল্পের গভীরে আছে শরীর, ভাষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বহুমাত্রিক ইতিহাস।
উপন্যাসে, বার্ধক্যে দাঁড়িয়ে লিলি নিজের জীবনকে ফিরে দেখেন। তার কণ্ঠে লেখক রেখেছেন অনুশোচনা। আত্মসমালোচনা আছে, ও আছে এমন এক উপলব্ধি—যে সমাজে তিনি সফল বলে বিবেচিত হয়েছিলেন, সেই সমাজই তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কটিকে ভেঙে দিয়েছিল। আত্মকথনমূলক ভঙ্গি উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণের বাইরে নিয়ে যায়। ফলে এই উপন্যাস হয়ে ওঠে স্মৃতি, অপরাধবোধ ও নৈতিক আত্মজিজ্ঞাসার এক গভীর বয়ান।
গল্পের সাদামাটা বয়ানটা দেখা যাক। লিলির শৈশবের উল্লেখযোগ্য ঘটনা পা বাঁধা। এই আচারকে নৃশংস মনে হবে কিন্তু এর পেছনে আছে সামাজিক কাঠামো। এই রিচুয়ালটি কেন এল? পা বাঁধার উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। ইতিহাসবিদদের একটা অংশ মনে করেন সং রাজবংশের রাজদরবারে অভিজাত নারীদের মধ্যে এই রীতি প্রথম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে মিং ও চিং যুগে তা সমাজের বিস্তৃত স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে হান সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি সামাজিক মর্যাদার সূচক হয়ে দাঁড়ায়।
তিন ইঞ্চির স্বর্ণপদ্মর ধারণা তৈরি হয়েছিল এক সময়। এ অর্থ, ছোট পা মানেই কোমলতা, সংযম, শালীনতা। কিন্তু এই সৌন্দর্য তৈরি হতে হাড় ভেঙে যেত। রক্তপাত ঘটত। এতেই শেষ না। চলাচল স্থায়ীভাবে সীমাবদ্ধ করে। কেন একটি সমাজ এত দীর্ঘকাল এমন প্রথা বজায় রাখে? এর উত্তর পাওয়া যায় সেকালের বিবাহবাজারে। সেই সময় কন্যাশিশু ছিল পরিবারের সামাজিক বিনিয়োগ। বিয়ে যত উঁচু ঘরে হতো, পরিবারের মর্যাদা তত বাড়ত। ছোট পা ছিল সেই বিনিয়োগের প্রমাণপত্র। তাই বলতে গেলে, শরীর হয়ে উঠেছিল পুঁজি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও আছে। দেখা যায় নারীরাই নারীর ওপর এই প্রথা প্রয়োগ করতেন। লিলির মা তার পা বাঁধেন। তবে এটা তার নিষ্ঠুরতা নয়। তিনি এটাকে সামাজিক নিরাপত্তা মনে করেন। নারী শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ কেবল বাহ্যিক শাসন নয়; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক সম্মতির ফল।
উপন্যাসটি এই দ্বৈততাকে সূক্ষ্মভাবে ধরেছে। লিলি একদিকে পা বাঁধার যন্ত্রণাকে স্মরণ করেন। আবার গর্বও অনুভব করেন। কারণ তার পা তাকে উচ্চবংশে বিয়ে নিশ্চিত করেছে। এই দ্বন্দ্বই শরীর-রাজনীতির মূল প্রশ্ন উত্থাপন করে। এর মাধ্যমে শোষণ সামাজিক স্বীকৃতির ভাষায় আবৃত হয়। এ সময় তা চিহ্নিত করা কি সহজ?
সমাজে যখন নারীশিক্ষা সীমিত, সেই সময় হুনানের জিয়াংইয়ং অঞ্চলে জন্ম নেয় এক অনন্য লিখনপদ্ধতি—নু শু (Nǜshū)। প্রায় ছয় থেকে সাতশো চিহ্ন নিয়ে গঠিত এই লিপি প্রধানত নারীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। অক্ষরগুলো সরু, ঢেউখেলানো, প্রায় সূচিকর্মের মতো। নু শু-র অধিকাংশ লেখা ছিল শোকগাথা, বিবাহোত্তর বিচ্ছেদের বেদনা, অথবা ব্যক্তিগত দুঃখের দলিল।
ঔপন্যাসিক লিসা সি। ছবি: লেখিকার ওয়েবসাইট
উপন্যাসে লিলি ও স্নো ফ্লাওয়ার একটি সাদা পাখায় নু শু-তে নিজেদের মনের কথা লেখে। সেই পাখা হয়ে ওঠে গোপন সংলাপের ক্ষেত্র। কিন্তু ভাষা যেমন সেতু, তেমনি বিভ্রান্তির উৎসও হতে পারে। একটি ভুল ব্যাখ্যা তাদের সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। এই বিন্দুতে উপন্যাসটি দেখায় যে ভাষা শুধু মুক্তির নিশ্চয়তা নয়; এটি মানবিক দুর্বলতার বাহকও।
লিলি ও স্নো ফ্লাওয়ারের সম্পর্কে একটি বিশেষ বিষয় আছে। ‘লাওতং’—চুক্তিবদ্ধ আত্মিক সঙ্গিনী। এটি কেবল বন্ধুত্ব নয়; সামাজিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। পরিবারগুলো সামাজিক মর্যাদা মিলিয়ে এই সম্পর্ক স্থির করত। অর্থাৎ নারীজীবনের ভেতরেও বিকল্প সম্পর্কের নেটওয়ার্ক ছিল।
কিন্তু এই সম্পর্কও সামাজিক কাঠামোর বাইরে নয়। লিলির সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার শ্বশুরবাড়ির মর্যাদা রক্ষা, এবং নিজের অবস্থান সুরক্ষার তাগিদ; সব মিলিয়ে সে স্নো ফ্লাওয়ারকে ভুল বোঝে। বার্ধক্যে এসে লিলি উপলব্ধি করেন, তার প্রকৃত ব্যর্থতা ছিল আত্মিক বিচ্ছেদ।
চীনের এই ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি বাংলায় বোঝা কঠিন। তবে বইটির অনুবাদে এই বিষয়গুলোর মোটামুটি স্পষ্টভাবেই এসেছে। বুঝতে খুব একটা অনুবিধা হয় না। পাশাপাশি চীনের এই সংস্কৃতি, নারীর জীবনের সঙ্গে যুক্ত আচার জানার জন্যও বইটি ভালো। বুক স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছেন মোশাররফ হোসাইন। অনুবাদে মূল পাঠের স্বাদ অক্ষুন্ন থাকবে। কেননা অনুবাদকের গদ্য মসৃন ও সাহিত্যমান সমৃদ্ধ। এর আগে ইসমাইল কাদারের ‘জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’ ও অ্যানি ক্যামেরনের ‘ডটার্স অব কপার ওম্যান’ (‘তাম্রপ্রভার মেয়েরা’ নামে) অনুবাদ করে প্রশংসা পেয়েছিলেন।
লিসা সি-র এই উপন্যাস অতীতের দলিল নয়; এটি বর্তমানের প্রতিফলন। লেখক ইতিহাসকে নৈতিক বক্তৃতায় বোরিং করে তোলেন না, বরং চরিত্রের জীবনের ভেতর দিয়ে দেখান—শাসন ও স্নেহ, যন্ত্রণা ও মর্যাদা, বন্ধন ও ভাষা একই সমাজে সহাবস্থান করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, স্নো ফ্লাওয়ার অ্যান্ড দ্য সিক্রেট ফ্যান’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শরীরকে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে নয়; ভাষাকে গোপন রাখা যায়, কিন্তু স্মৃতিকে নয়। লিলির বার্ধক্যের আত্মস্বীকারোক্তি তাই ব্যক্তিগত অনুশোচনার চেয়েও বড়—এটি ইতিহাসের কাছে এক নারীর সাক্ষ্য।