পুরো প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় একটি জিন্স পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে আসতে পারে। তুলার খামার, রং কারখানা, ওয়াশিং ইউনিট ও পোশাক কারখানা হয়ে প্রিয় জিন্সটি আপনার আলমারিতে পৌঁছে। প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপ হতে পারে আলাদা আলাদা স্থানে। সেই জিন্সটি হয়তো কখনো পরাই হয়নি, কিন্তু দেখায় পুরোনো বা ব্যবহৃত। এ লুক আনতে বটম ওয়্যারটিকে যেতে হয় স্টোনওয়াশ, স্যান্ডিং, রাসায়নিক ফেডিং কিংবা লেজার ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়ায়।
এসব প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিক লাগে। এ কারণেই ফ্যাশন শিল্পে টেকসই উৎপাদন নিয়ে আলোচনার বড় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে ডেনিম। কারণ, বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস এই শিল্প।
এখন অনেক ব্র্যান্ড নিজেদের জিন্সকে ‘সাসটেইনেবল’ বা টেকসই ও ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ বা পরিবেশবান্ধব বলে প্রচার করছে। কারো কারো দাবি তারা রিজেনেরাটিভ কটন, রিসাইকেলড ফাইবার বা কম পানিতে উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু এসব দাবি কতটা সত্য, তা বোঝা সহজ নয়। কারণ সাসটেইনেবিলিটি বা টেকসই উৎপাদনের নির্দিষ্ট কোনো বৈশ্বিক মানদণ্ড নেই।
স্বচ্ছতা ও টেকসই উদ্যোগের জন্য পরিচিত ব্র্যান্ড এভারলেন-কে সম্প্রতি কিনে নিয়েছে চীনের ফাস্ট-ফ্যাশন জায়ান্ট শেইন। এখানে শেইন ভাবমূর্তি কিনল নাকি সত্যি সত্যি টেকসই মানদণ্ডে উন্নীত হতে যাচ্ছে, এমন প্রশ্ন উঠছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, কম দামে দ্রুত উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে টেকসই উৎপাদনের দ্বন্দ্ব কতটা গভীর। কারণ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া সাধারণত বেশি ব্যয়বহুল। ফলে ক্রেতাদের সামনে তৈরি হয় জটিল সমীকরণ—কৃষি পদ্ধতি, রাসায়নিক ব্যবহার, শ্রম অধিকার ও দামের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই ডেনিম খুঁজতে হলে আগে জানতে হবে জিন্স আসলে কীভাবে তৈরি হয়।
ছবি: এপি
শুরুটা তুলার খামারে
বেশিরভাগ জিন্সই তুলা থেকে তৈরি হয়। আর তুলা চাষে অনেক সময় বিপুল পরিমাণ পানি, সার ও কীটনাশক লাগে।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান টেক্সটাইল এক্সচেঞ্জের চিফ ইমপ্যাক্ট অফিসার বেথ জেনসেন বলেন, অনেক ব্র্যান্ড এখনো জানেই না তাদের ব্যবহৃত তুলা কোথা থেকে আসে। ডেনিম উৎপাদন যেহেতু বিভিন্ন দেশ ও সরবরাহকারীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তাই শ্রম পরিস্থিতিও ট্র্যাক করা কঠিন।
তার ভাষায়, ‘শিল্প হিসেবে আমাদের এখনো অনেক দূর যেতে হবে।’
ফ্যাশন শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় কিছু ব্র্যান্ড এখন রিজেনেরাটিভ কটনের দিকে ঝুঁকছে। এ পদ্ধতিতে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং রাসায়নিক ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে জেনসেন বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় যা সম্ভব, ভারতের বা অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ায় তা কার্যকর নাও হতে পারে।
রিজেনেরাটিভ কটন বলতে এমন তুলা চাষকে বোঝায়, যেখানে শুধু ফসল উৎপাদন নয়, জমির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের দিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়। সাধারণ তুলা চাষে অনেক সময় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও পানি ব্যবহারে মাটির উর্বরতা কমে যায়। রিজেনেরাটিভ পদ্ধতির লক্ষ্য হলো সেই ক্ষতি কমানো বা উল্টো মাটিকে আরো জীবন্ত ও স্বাস্থ্যবান করা।
ডেনিম তৈরিতে কেন এত পানি ও শ্রম লাগে
তুলা থেকে সুতা বানানো হয় এবং সাধারণত ইন্ডিগো রঙে রাঙানো হয়। এ ধাপে প্রচুর পানি ও রাসায়নিক লাগে। এরপর কাপড় বোনা, কাটা ও সেলাই করে জিন্স তৈরি করা হয়।
তবে আসল জটিলতা শুরু হয় ‘ফিনিশিং’ ধাপে। এখানেই জিন্সকে ফেডেড, পুরোনো বা ছেঁড়া লুক দেয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিপিডি ওয়াশহাউজের মালিক বিল কার্টিন বলেন, ডেনিম ফিনিশিং সাধারণত ওয়েট ও ড্রাই এ দুই ভাগে বিভক্ত।
ওয়েট প্রসেসে পানি, রাসায়নিক ও বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট দিয়ে জিন্সের রঙ হালকা বা টোন পরিবর্তন করা হয়। আগে ব্যবহৃত লুক আনতে মেক্সিকো থেকে পিউমিস পাথর আমদানি করা হতো, যা পরিবহন ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ বাড়াত। এখন অনেক কারখানা এনজাইমভিত্তিক বিকল্প ও ওজোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যাতে কম পানি লাগে।
অন্যদিকে ড্রাই প্রসেসে হাতের কাজ বা লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে জিন্সে ঘষা, ভাঁজ বা ছেঁড়া নকশা তৈরি করা হয়। কার্টিনের মতে, লেজার প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর এবং কম শ্রমনির্ভর।
এছাড়া অনেক স্ট্রেচি জিন্সে পলিয়েস্টার বা ইলাস্টেনের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক সিনথেটিক উপাদান থাকে, যেগুলো থেকে সময়ের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়াতে পারে।
ছবি: এপি
টেকসই জিন্স বানানো কঠিন কেন
ফ্যাশন ডিজাইনার মারিয়া ম্যাকম্যানাস অনেক বছর ধরে নিজের লো-ইমপেক্ট ফ্যাশন লাইনে ডেনিম যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশিং প্রক্রিয়ার কারণে তিনি তা করতে পারছিলেন না। তার ভাষায়, ‘পানি ও রাসায়নিক ব্যবহারের দিক থেকে এটা খুবই আগ্রাসী প্রক্রিয়া।’
শেষ পর্যন্ত তিনি জাপান থেকে ডার্ক র ডেনিম সংগ্রহ করেন এবং পুরো ওয়াশিং ধাপই বাদ দেন। ফলে তার জিন্সে বাজারের প্রচলিত ফেডেড বা ছেঁড়া লুক অনুপস্থিত ছিল।
পরে তিনি বড় ডেনিম ব্র্যান্ড আগোল্ডে-এর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। রিজেনেরাটিভ কটন ব্যবহারের জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি সিটিজেনস অব হিউম্যানিটি।
এ সহযোগিতার মাধ্যমে ম্যাকম্যানাস এমন অবকাঠামো পান, যা ছোট ব্র্যান্ড হিসেবে তার পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। এর মধ্যে রয়েছে রিজেনেরাটিভ কটন চাষিদের সঙ্গে সংযোগ, পেট্রোক্যামিকেল ডাই-এর বদলে বায়োক্যামিকেল ডাই ব্যবহার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কঠোর নজরদারি।
তবে তিনি স্বীকার করেন, পুরো প্রক্রিয়াই অত্যন্ত জটিল। কখনো রিজেনেরাটিভ কটনের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় সরবরাহ ব্যবস্থাও যাচাই করা কঠিন হয়।
এসব কারণে দামও বেড়ে যায়। ম্যাকম্যানাসের ব্র্যান্ডের এক জোড়া জিন্সের দাম প্রায় ৭০০ ডলার। তার মতে, ছোট পরিসরে উৎপাদনের কারণেই খরচ এত বেশি।
টেকসই জিন্স চিনবেন কীভাবে?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ‘সাসটেইনেবল’ শব্দ দেখেই বিশ্বাস না করে ব্র্যান্ডটি তাদের কাঁচামাল, উৎপাদন ও শ্রমনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে।
ফ্যাশন পরামর্শক ডানা ডেভিস বলেন, শুধু একটি বিশেষ কালেকশনের প্রচারণা নয়, পুরো ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্র্যান্ডটি শ্রম অধিকার, টেক্সটাইল ও উৎপাদন কারখানা নিয়ে কতটা স্বচ্ছ—সেটা দেখা জরুরি।
তার মতে, গ্রিনওয়াশিং বা পরিবেশবান্ধব হওয়ার অতিরঞ্জিত দাবি এখন বড় সমস্যা।
কিছু সার্টিফিকেশন সহায়ক হতে পারে। যেমন বি কর্প সার্টিফিকেশন, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও পরিবেশগত কার্যক্রম মূল্যায়ন করে। আবার জিন্সে ব্যবহৃত লাইওসেলের মতো উদ্ভিদভিত্তিক ফাইবার যদি ফরেস্ট স্টুয়ার্ডশিপ কাউন্সিল (এফএসসি) অনুমোদিত উৎস থেকে আসে, তবে তা তুলনামূলকভাবে দায়িত্বশীল উৎস নির্দেশ করে।
তবে সবচেয়ে কার্যকর উপায় সম্ভবত কম জিন্স কেনা, বেশি দিন ব্যবহার করা, কম ধোয়া এবং সেকেন্ডহ্যান্ড জিন্স কেনা।
লেভি স্ট্রস অ্যান্ড কোং-এর লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, যদি ৩ কোটি ৪২ লাখ মানুষ—অর্থাৎ প্রতি ১০ আমেরিকানের মধ্যে ১ জন—নতুনের বদলে সেকেন্ডহ্যান্ড জিন্স কেনেন, তাহলে প্রায় ১৫০ কোটি পাউন্ড বা প্রায় ৭ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব। এটি প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার জ্বালানি তেলচালিত গাড়ির নিঃসরণের সমান।
বেথ জেনসেনের কথায়, ‘সবচেয়ে টেকসই কাজ হলো এমন একটি পণ্য ব্যবহার করা, যেটা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।’
এপি অবলম্বনে