দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

ফিলিস্তিনকে ফ্রান্সের স্বীকৃতির পরিকল্পনা, স্টারমারের ওপর পক্ষ নেয়ার চাপ

এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে কিয়ার স্টারমারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, কারণ লেবার পার্টি ও মন্ত্রিসভায় ফিলিস্তিন স্বীকৃতি নিয়ে বিদ্রোহের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।

নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ভিক্টর কাটান বলেন, ‘এটি অবশ্যই যুক্তরাজ্যের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র, এবং কয়েক সপ্তাহ আগে মাখোঁর যুক্তরাজ্য সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।‘

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের পরবর্তী সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মূলত ইসরায়েলের গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বে একপ্রকার উদাসীনতার প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাতে নাটকীয় ভঙ্গিতে সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এই ঘোষণায় মাখোঁ স্পষ্টভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পথ থেকে সরে এসে একটি আলাদা কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং অন্যান্য জি-৭ দেশের ওপর তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্টজ এবং মাখোঁ শুক্রবার এক জরুরি ফোনালাপে অংশ নেন। এই আলোচনার পর তারা যৌথভাবে গাজায় খাদ্য অবরোধ প্রত্যাহার, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তির দাবি জানান। তবে এই আলোচনায় ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে স্টারমার বা ম্যার্টজের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

জার্মান সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, তারা স্বল্পমেয়াদে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না। স্টারমার তার পূর্বের অবস্থানেই অটল থেকেছেন— ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন তা শান্তির একটি ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গৃহীত হবে।

স্টারমার বলেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি অবশ্যই একটি ধাপ হতে হবে। আমি এ বিষয়ে কোনো দ্বিধায় নেই। কিন্তু এটি এমন একটি পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত, যার শেষ লক্ষ্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা।‘

ফ্রান্সের যুক্তি, যখন যুদ্ধ বন্ধ করার কোনো লক্ষণ নেই, তখন ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত তাদের হাতে থাকা কূটনৈতিক উপায় ব্যবহার করে অচলাবস্থার অবসান ঘটানো।

নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ভিক্টর কাটান বলেন, ‘এটি অবশ্যই যুক্তরাজ্যের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য খুব ঘনিষ্ঠ মিত্র, এবং কয়েক সপ্তাহ আগে মাখোঁর যুক্তরাজ্য সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।‘

ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এবং পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন।

মাখোঁর এই ঘোষণা জাতিসংঘে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের আয়োজিত দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রাক্কালে এলো, যেখানে একটি শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে এই সম্মেলন আগেই পিছিয়ে গিয়েছিল।

সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে মাখোঁ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবেন। ফ্রান্স আশা করছে, ততদিনে অন্যান্য জি-৭ রাষ্ট্রও একই পথ অনুসরণ করবে।

এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে কিয়ার স্টারমারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, কারণ লেবার পার্টি ও মন্ত্রিসভায় ফিলিস্তিন স্বীকৃতি নিয়ে বিদ্রোহের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘যুক্তরাজ্যের এখনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না। সরকার যদি সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে, তাহলে সেই সময় আসবে না। অতীতে সুযোগ ছিল, তা কাজে লাগানো হয়নি।‘

ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও শান্তি কর্মী গার্শন বাসকিন বলেন, পশ্চিমা শক্তিগুলোর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেয়ার কারণে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, ‘কত বছর ধরে আপনি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলবেন অথচ এক রাষ্ট্রকেই শুধু স্বীকৃতি দেবেন? ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ, এবং এটিকে জি-৭ এর অন্যান্য সদস্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকেও অনুসরণ করা উচিত। এটা একটা বার্তা দেয়— যে বিশ্ব এই সংঘাতের সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।‘

আরও