গতকাল হাজার হাজার আন্দোলনকারী যন্তর মন্তর থেকে পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, লাঠি ও ব্যাটন ব্যবহার করে। বিভিন্ন স্থানে ধাক্কাধাক্কি, পাল্টাপাল্টি ইট-পাথর নিক্ষেপ এবং ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনায় অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে পাঁচজনের বেশি আইপিএস কর্মকর্তাসহ অন্তত ৫০ নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। আটক করা হয়েছে ৭০ জনের বেশি আন্দোলনকারীকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়।
কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, সিপিআইএম, সিপিআই, ডিএমকেসহ ভারতের বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পুলিশি অভিযানের নিন্দা করেছে। রাজপথ ও পার্লামেন্টে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে প্রথমবার সিজেপি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গতকাল আলোচনায় বসে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তবে শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ, সোনম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত মুক্তি ও নিহত পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা। সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় ওয়াংচুকও অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ভারতের পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল পরীক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন সিজেপি। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো তরুণ যন্তর মন্তরে জড়ো হন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। একপর্যায়ে মূল সমাবেশস্থলে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ উপস্থিত হন। আন্দোলনকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন।
পুলিশ আগেই যন্তর মন্তর, পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও মধ্য দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় কয়েক স্তরের ব্যারিকেড বসিয়েছিল। পার্লামেন্ট ভবনের দিকে যাওয়া বেশ কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়লেও ছোট ছোট দল আশপাশের সরু গলি ও বিকল্প পথ ব্যবহার করে পার্লামেন্টের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে। কয়েকটি স্থানে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন বিক্ষোভকারীরা। এর পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে একাধিক দফায় কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠি ও ব্যাটন দিয়ে ধাওয়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে ছড়িয়ে পড়া দৃশ্যে পুলিশকে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করতে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে দেখা যায়। পুলিশ অবশ্য দাবি করেছে, পরিস্থিতি পেশাদারত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। সংঘর্ষে মাথা ফেটে রক্তাক্ত হওয়া, হাত-পা ভাঙা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পাওয়া আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তরেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। গুরুতর আহত কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের হিসাবে, সংঘর্ষে দিল্লি পুলিশ ও বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনীর ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের বেশি আইপিএস কর্মকর্তা রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের ছোড়া পাথরে দিল্লি পুলিশের দুটি বাসের সামনের কাচ ভেঙে গেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে শিক্ষার্থী নন বলে দাবি করেছে পুলিশ। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দলগুলো।
রাজপথের সংঘর্ষ ও আন্দোলনের ব্যাপকতায় চাপের মুখে পড়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা ২ ঘণ্টার ব্যবধানে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে দুবার বৈঠক করেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। দাবিগুলো হলো হাসপাতালে থাকা পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, পরীক্ষায় অনিয়মের দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করা অথবা বরখাস্ত করা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়া।
নাড্ডা জানিয়েছেন, বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা শুরু হয়। বিকাল ৪টার দিকে সিজেপি প্রতিনিধিরা লিখিত দাবি জমা দেন। বৈঠককে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ উল্লেখ করে তিনি আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
তবে বৈঠকের পর সিজেপি জানিয়েছে, সরকার তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, ‘মন্ত্রী যথাযথ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু দাবি পূরণের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি থেকে সরে যাবেন না। সিজেপি নেতাদের দাবি, নাড্ডা যন্তর মন্তর ও আশপাশে নতুন করে দমন অভিযান না চালানোর আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে পুলিশি অভিযান বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।’
এদিকে ২৩ দিন ধরে অনশনরত পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাস্থ্যগত অবস্থার অবনতি হলে পুলিশ তাকে জোর করে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে দেয়া হাতে লেখা বার্তায় তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারী তরুণদের পার্লামেন্টে গিয়ে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত অথবা পার্লামেন্ট সদস্যরা হাসপাতালে এসে তাদের বক্তব্য না শোনা পর্যন্ত তিনি অনশন ভাঙবেন না।’
তরুণদের এ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন ভারতের প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দল। পুলিশি অভিযানের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিরোধী দলগুলোর নেতারা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে তরুণবিরোধী প্রধানমন্ত্রী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অপরাধীরা অবাধে ঘুরে বেড়ালেও ন্যায্য দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের টেনেহিঁচড়ে নেয়া হচ্ছে এবং মারধর করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ গণতান্ত্রিক আচরণ নয়।’
তৃণমূল কংগ্রেস এমপি মহুয়া মৈত্র, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব ও এমপি ডিম্পল যাদব আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, বৃন্দা কারাতসহ দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা যন্তর মন্তরের কর্মসূচিতে অংশ নেন।
আন্দোলনের প্রভাব পড়ে পার্লামেন্টেও। বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে সিজেপির আন্দোলন ও পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে বিরোধী সদস্যদের হইচইয়ের কারণে লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যক্রম কয়েক দফা মুলতবি করা হয়।