যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ভেসে বেড়ানো বেলুনটি সম্প্রতি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছিল। উভয় দেশের মধ্যে তখন থেকেই উত্তেজনা ক্রমবর্ধমান। এরই মধ্যে মার্কিন আকাশে সন্দেহজনকভাবে চীনা বেলুনের উপস্থিতি সেই উত্তাপে কিছুটা ঘি ঢেলেছে বলে শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। খবর বিবিসি।
বিবিসি নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি এফ২২ জেট যুদ্ধবিমান থেকে বেলুনটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদ করলে বেলুনটি সাউথ ক্যারোলাইনার কাছে আটলান্টিক মহাসাগরে মার্কিন জলসীমায় নেমে আসে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর মার্কিন উপকূল থেকে ছয় নটিক্যাল মাইল দূরে বেলুনটি পানিতে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র বেলুনটিকে চীনা স্পাই বেলুন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেসামরিক চালকহীন বেলুনটিতে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এটি ছিল আবহাওয়া পর্যবেক্ষক বেলুন। অবশ্য মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের দাবি, বেলুনটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর নজরদারি করেছে। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা ভেবে শুরুতেই এটি ধ্বংস করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২২ সালের নভেম্বরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে এক বৈঠক করেন। তখন বাইডেন বলেছিলেন, আমরা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধে জড়াতে চাই না। এরপরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করে। এছাড়া জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানো ও সহযোগিতার কথাও বলেছিলেন। তবে এই এক বেলুনকাণ্ড অনেক শঙ্কা তৈরি করেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি দুদিনের সফরে যাওয়ার কথা ছিল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের। এর আগেই আমেরিকার আকাশে ভেসে আসে সন্দেহজনক চীনা স্পাই বেলুন। এ ঘটনায় বেইজিং সফর স্থগিত করেন তিনি।
এটা তেমন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। বেলুনটি নিম্ন স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলেই ছিল। প্রায় ১৮ হাজার মিটার উপরে। এটি সৌর প্যানেলে সজ্জিত ছিল। সাধারণত আবহাওয়াসংক্রান্ত গবেষণায় ব্যবহূত বেলুনের চেয়ে অনেক বড়। তবে চীন বলছে, মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য বেলুনটি আকাশে ওড়ানো হয়েছিল। বাতাসের কারণে বেলুনটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে নির্দিষ্ট গন্তব্যে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় চলে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এ যুক্তি মেনে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে স্পাই বেলুন বলে অভিহিত করে। ৪ ফেব্রুয়ারি বেলুনটিকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ করে আটলান্টিক মহাসাগরে ভূপাতিত করে।
ব্রিটিশ সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষকরা বলছেন, বেলুনটি মার্কিন আকাশসীমায় প্রবেশ করা উচিত হয়নি। অন্তত ব্লিংকেনের সফরের আগ মুহূর্তে তো নয়ই। এমন ঘটনা উভয় দেশের সম্পর্ক বৈরী করার জন্য উসকানিমূলক। নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের আকাশসীমায় সন্দেহজনক বেলুনটি ধ্বংস করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক। তবে ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশ। এজন্য বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে, এটি গোপনীয় নয়। তবে বেলুনটির গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের যথেষ্ট সক্ষমতা ছিল না। পেন্টাগন কর্তৃপক্ষও বিষয়টি স্বীকার করেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা জোরালো হয়, তখন ক্ষুদ্র ঘটনাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তাই অনিশ্চিত পরিণতি প্রতিরোধ করতে শিগগিরই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি।