মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বদলে দিচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা

বিশ্ব যখন করোনা মহামারি মোকাবেলায় বিপর্যস্ত তখনও মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন ইয়েমেনে সামরিক বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি সামরিক জোট। জাতিসংঘের তত্ত্ববধানে ৯ এপ্রিল থেকে ইয়েমেন যুদ্ধে ‘যুদ্ধ বিরতি’ ঘোষণা করা হলেও সৌদি সামরিক জোট তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। পূর্ব থেকে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে থাকা ইয়েমেনে এই হামলা করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আরও বিপর্যস্ত অমানবিক পরিস্থিতি তৈরী করছে।

বিশ্ব যখন করোনা মহামারি মোকাবেলায় বিপর্যস্ত তখনও মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন ইয়েমেনে সামরিক বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি সামরিক জোট। জাতিসংঘের তত্ত্ববধানে ৯ এপ্রিল থেকে ইয়েমেন যুদ্ধে ‘যুদ্ধ বিরতি’ ঘোষণা করা হলেও সৌদি সামরিক জোট তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে। পূর্ব থেকে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে থাকা ইয়েমেনে এই হামলা করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আরও বিপর্যস্ত অমানবিক পরিস্থিতি তৈরী করছে।  তবে এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখেও হুতি বিদ্রোহীরা ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দি বিনিময় প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরবকে। সম্প্রতি তারা সৌদি জেলে থাকা ৮ ফিলিস্তিনির মুক্তির বিনিময়ে আটককৃত সৌদি পাইলট ও অফিসারের মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব একদিকে হুতি বিদ্রোহীদের আঞ্চলিক বন্ধু বাড়াবে সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বদলে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সৌদি জেলে অনেক হুতি বিদ্রোহী গ্রেফতার থাকা সত্ত্বেও তারা ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের মুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেখানে হুতি বিদ্রোহীরা ইরান-সিরিয়া সমর্থিত শিয়া অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা সুন্নী মুসলিম। এই বন্দি বিনিময়  প্রস্তাব মধ্যেপ্রাচ্যে যে শিয়া-সুন্নী সমীকরণের স্পষ্ট পরিবর্তন হচ্ছে তারই ইঙ্গিত বহন করে। 

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় বিদ্রোহের মুখে ও  গালফ ভুক্ত দেশসমূহের চাপে ইয়েমেনী প্রেসিডেন্ট  আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তার তৎকালীন ডেপুটি মনসুর হাদির কাছে। কিন্তু সৌদিপন্থি হাদি ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে সক্রিয় হয় আল কায়েদা, শুরু হয় দক্ষিণাঞ্চলীয় উপজাতিদের জোট এনএনএসসি এর বিচ্ছিন্ন হামলা। সেই সাথে সরকারপন্থি বাহিনীও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর অনুগত। ভঙ্গুর এই অবস্থায় ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা অন্যান্য সুন্নি গোষ্ঠীদের সমর্থন নিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয়। মনসুর হাদি ইডেন প্রদেশে হয়ে সৌদি আরব পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তার সরকার চলছে রিয়াদ থেকে। অন্যদিকে হুতিরা গঠন করেছে ইরান ও সিরিয়া সমর্থিত সরকার এনএসজি। নিজ সীমান্তের পাশে চিরশত্রু শিয়াদের এরুপ কর্তৃত্বে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের লজিস্টিক সাপোর্টে হামলা চালাচ্ছে। হামলার মুখে একসময় প্রেসিডেন্ট সালেহ হামলা বন্ধের বিনিময়ে আলোচনায় বসতে রাজি হলেও হুতিরা তাকে হত্যা করে। এদিকে দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেন ভাঙা নিয়েও মনসুর হাদি পন্থিদের মধ্যে মতনৈক্য তৈরী হয়েছে। ইয়েমেনে অলিখিতভাবে আফগানিস্তানের তালেবানের মতো নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের সাথে রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি সুন্নি গ্রুপ। এই পর্যন্ত সৌদি হামলায় দশ হাজার নারী-পুরুষ নিহতের কথা বলা হলেও আন্তজার্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান (অঈখঊউ) এসিএলইডি'র মতে মারা গেছে ১,১২০০০ লোক। তৈরী হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়।

 ইয়েমেন সংকট নিয়ে সৌদি জোট প্রায় ব্যর্থই বলা চলে। স্থলবাহিনীতে  দুর্বল সৌদি আরব ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের উপর বিমান হামলা চালিয়েও সফল হয়নি। বরং হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি  অ্যারামকোর দুইটি ক্ষেত্রে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সৌদির দিকে তাক করা আছে হাজারো ব্যালিস্টিক মিসাইল। এভাবে যুদ্ধে  সৌদি ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা সংকট নিয়ে খোদ রাজপরিবারেই ক্ষোভ রয়েছে ।  

ইয়েমেন যুদ্ধের যখন পাঁচ বছর চলে তখন সৌদি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনির মুক্তিকে সামনে এনেছে হুতি বিদ্রোহীরা। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের সাথে সংশ্লিষ্টতার দায়ে গতবছরের এপ্রিলে এই ৮ ফিলিস্তিনি নাগরিককে সৌদি আরবে গ্রেফতার করা হয়। চলতি মে মাসে তাদের বিরুদ্ধে সৌদি রয়েল কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা তাদের মুক্তির বিনিময়ে তাদের হাতে আটককৃত এক সৌদি পাইলট ও দুই অফিসারের মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব মূলত ভূ-রাজনৈতিক কারণে। এই প্রস্তাবের সাথে হুতি বিদ্রোহীদের বেশ স্বার্থ জড়িত। প্রথমত এর মাধ্যমে হুতি বিদ্রোহীরা তাদের প্রভাবকে দেশের বাইরে ছড়িয়ে দিতে চায়। ফিলিস্তিনীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়তে চায়। সৌদি আরবে ফিলিস্তিনী গ্রেফতার নিয়ে মুসলিম বিশে^ সৌদি সমালোচনা বেগবান করতে চায়। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়ে মুসলিম বিশ্বে হিরো হতে চায়।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই বন্দিবিনিময় প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নী মেরুকরণের বদলকে আরও শক্তিশালী করবে। মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতি মূলত এতদিন চলেছে শিয়া- সুন্নি বিভেদের। সুন্নী সংখ্যাগরিষ্ঠ গলফ দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি দেশের নেতৃত্বে ছিল সৌদি আরব। অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল শিয়া দেশ ইরান। বিশেষ করে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর শিয়া-সুন্নী বিভেদ আরও দৃঢ় হয়ে উঠে। সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইরানের এতদিন বন্ধু ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ। কিন্তু সৌদি হঠকারি নীতি ইরানকে সৌদি বিরোধী একটি নতুন বলয়ের নেতৃত্বে আসতে সহযোগিতা করেছে। নতুন বলয়ে উৎসাহ দিয়েছে ইসরাইলের প্রতি সৌদি আরবের নরম সুর ও ইরানের আপোষহীন গর্জন।

শিয়া সুন্নী বিভেদ রেখা গৌণ হওয়ার শুরুটা হয় মূলত আরব বসন্তের পর থেকে। বিশেষ করে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এর প্রবক্তা মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সৌদি বনিবনা না হওয়া থেকে। ইসরাইলের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসলে ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি প্রথম সফরে সৌদি আরব গিয়ে সৌদি বাদশাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আসেন। কিন্তু সৌদি আরব সে আনুগত্য গ্রহণ করেনি। সৌদি - আমিরাতের অর্থায়ন ও মার্কিন ইসরাইলি পরিকল্পনায় সেনা অভূত্থানের মাধমে ব্রাদারহুড সরকারকে হঠানো হয়। নিজ দেশে থেকে ব্রাদারহুডের মিশরের নেতারা স্থান পেল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে। ব্রাদারহুডের পক্ষ নিল সৌদি আরবের আরেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ক। ব্রাদারহুড সরকারকে হঠানোকে কেন্দ্র করে সৌদি আমিরাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল রাজনৈতিক ইসলামের সমর্থক বেশ কিছু মুসলিম দেশ। অন্যদিকে একই ইস্যুতে সৌদি-আরব আমিরাত-মিশর বলয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের।

 একই মেরুকরণে যুদ্ধ চলতে থাকে সিরিয়া ও লিবিয়ায়। লিবিয়ায় আরব বসন্তের পক্ষে সৌদি বিরোধী বলয় আর অন্যপক্ষে সৌদি বলয়। সিরিয়ায় সমীকরণ মিশ্র ও ত্রিমুখী। কিন্তু এই ত্রিমুখী সমীকরণ থেকেও ছিটকে পড়ে সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়ার সংকটের অংশীদার হয় রাশিয়া-তুরস্ক-ইরান। ইরাকের নতুন বাস্তবতায় ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ইরানের সাথে। ফলে ইরান, ইরাক, সিরিয়া হয়ে লেবানন পর্যন্ত সৌদি বিরোধী প্রক্সি যুদ্ধে জয়ী হতে থাকে। এই প্রক্সি যুদ্ধে নতুন যুক্ত হয় হুতি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে ছুটছে ইরানি মিসাইল।

সুন্নি হামাসের প্রতি শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের বন্ধুত্বের হাত এই ভূরাজনীতিকে কেন্দ্র করে। প্রথম ফিলিস্তিনের ফাতাহ গ্রুপকে অনেকেই ইসরাইলের সাথে সমঝোতা গ্রুপ হিসাবে দেখে। বিখ্যাত লেখক এডওয়ার্ড সাঈদ  ফাতাহ সমর্থিত ক্যাম্প ড্যাভিড চুক্তিকে ‘শতাব্দীর সেরা আত্মসমর্পণ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে সদা আপোষহীন গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসের পাশে সবসময় ছিল ইরান-তুরস্ক -কাতার। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলাও হামাসকে ১ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে কাতার।  হামাসকে আবার সন্ত্রাসী গ্রুপ দাবি করে সৌদি আরর। ফলে সৌদি আরবের সাথে হামাস সমর্থনকারীদের দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। 

 এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয় কাতার সংকটের সময়। সৌদি আরবের নেতৃত্বে  মধ্যপ্রাচ্যের  কয়েকটি হঠাৎ করেই কাতারের বিরুদ্ধে ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেওয়াসহ নানা অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সংকটে কাতারের পাশে দাঁড়ায় তুরস্ক, ইরান। এই ঘটনা সৌদি আরব বিরোধী একটি স্পষ্ট বলয় তৈরী করে দেয়। যেখানে শক্তভাবে তুরস্ক, ইরান, কাতার, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ ও হুতি জোট রয়েছে। ইসরাইল ও সৌদি আরব ঘনিষ্ট সম্পর্ক সৌদি বিরোধী এই অলিখিত জোট তৈরী হতে অনুঘটক হয়েছে। এই জোটে শিয়া-সুন্নী বিভেদ হয়ে উঠেছে গৌণ। আফগানিস্তানে তালেবানের স্বীকৃতি মেনে নেওয়া জোটে আরেকটি বন্ধু বাড়াল। এখন সুন্নী তালেবানের সাথে সম্পর্ক তৈরী হচ্ছে শিয়া ইরানের। এই জোটের মূল চালিকা শক্তি ইসরাইল বিরোধীতা, সৌদি কর্তৃত্ব না মানা, ফিলিস্তিনের পাশে সমর্থন জোরদার করা ও ব্রাদারহুডকে মধ্যপ্রাচ্যে মেনে নেওয়া।

প্রত্যেকটা দেশ নিজ নিজ স্বার্থে এই অলিখিত জোটে যোগ দিচ্ছে। যেমন সিরিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমি উদ্ধার। ইসরাইলের দখলে থাকা অপেক্ষাকৃত উঁচু এই মালভূমি থেকে সিরিয়ার দামেস্ক শহরের দুরুত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। সুতরাং এই মালভূমি উদ্ধার করতে না পারলে কিংবা ইসরাইল বিরোধী দেশগুলোতে নিঃশর্তে পাশে না পেলে সিরিয়া যেকোন মুহুর্তে দখল নিতে পারে ইসরাইল । 

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ক্রমশ বদলে যাচ্ছে ইসরাইলকে মেনে নেওয়া না নেওয়া নিয়ে। সমীকরণে যোগ হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিস্তৃত হচ্ছে আফগানিস্তান থেকে তুরস্ত পর্যন্ত। ভবিষ্যতে পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে ইসরাইলে কতৃত্ব মানা না মানা নিয়ে স্পষ্ট বিভাজিত হয়ে উঠবে দু’টি গ্রুপ। পশ্চিম তীর দখল করে জর্ডানে দখলদারিত্বের স্বপ্ন দেখা ইসরাইল জর্ডানে পা দিলে সেখানেও হিজবুল্লাহ, হামাস বা হুতিদের মতো রাজনৈতিক শক্তিশালী গোষ্ঠীর উত্থান হবে। সে গোষ্ঠীও তৈরী হবে সৌদি-ইসরাইল বিরোধী। ফলে ইসরাইল লবির সাথে ঘনিষ্ঠতা সৌদি রাজপরিবারের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করছে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েই যাবে।

 লেখক:   শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও