ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে দীর্ঘ মেয়াদে পেছনে ঠেলে দিতে এবং পরমাণু বোমা তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমা বাড়াতে ইসরায়েলের আকস্মিক সামরিক হামলার লক্ষ্য ছিল অনেকটাই স্পষ্ট। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা নয়, বরং হামলার ব্যাপকতা, লক্ষ্যবস্তুর ধরন এবং ইসরায়েলি নেতাদের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ইসরায়েলের আরো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য রয়েছে। এবং সেটা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া, এমনকি ক্ষমতা থেকেও সরিয়ে দেয়া।
শুক্রবার ভোরে চালানো ইসরায়েলি হামলায় কেবল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোই নয়, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা, সামরিক কমান্ড চেইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ আক্রমণ দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধাক্কা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের কর্মকর্তা মাইকেল সিং বলেন, ‘ধরা যাক, ইসরায়েলের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে তেহরানে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা। তারা ইরানিদের রাস্তায় নামতে দেখতে চায়। প্রথম দফার হামলায় বেসামরিক প্রাণহানি সীমিত রেখে ইসরায়েল যেভাবে কাজ করেছে, তা থেকেও বোঝা যায় এটি কেবল সামরিক অপারেশন নয়, বরং এটি বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ।'
হামলার পরপরই এক ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের মুক্তির দিন আর দূরে নয়। সেই দিন আমাদের দুই প্রাচীন জাতির বন্ধুত্ব আবার নতুনভাবে বিকশিত হবে।‘ তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের হিজবুল্লাহবিরোধী পদক্ষেপে যেমন লেবাননে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি সিরিয়ায় আসাদ সরকারেরও পতন ঘটেছে।
ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলা তেহরানকে বড় ধাক্কা দিলেও দেশটির জনগণের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে। ফলে জনগণের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা বিক্ষোভের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মতো একটি নিরাপত্তানির্ভর শাসনব্যবস্থাকে হঠানো সহজ হবে না।
মাইকেল সিং নিজেও সতর্ক করে বলেন, ‘ঠিক কী পরিস্থিতিতে ইরানে জনগণের বিদ্রোহ বাস্তবে রূপ নিতে পারে, তা এখনো কেউ জানে না।‘
ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, শুক্রবারের আক্রমণ ছিল একটি বড় পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। পরবর্তী ধাপে তারা আবারো ইরানের পরমাণু অবকাঠামোকে টার্গেট করতে পারে। যদিও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের পক্ষে এককভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
ইরান বারবার দাবি করে আসছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সম্প্রতি জানিয়েছে, তেহরান আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
শুক্রবারের হামলায় ইসরায়েল যেভাবে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক সিমা শাইন বলেন, ‘এই লোকেরা বহু বছর ধরে দায়িত্বে ছিল। তারা শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা ভিত্তিকে স্থিতিশীল রেখেছিল। এদের হত্যার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীতে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।‘
তিনি আরো বলেন, ‘একটি আদর্শ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল অবশ্যই ইরানে সরকার পরিবর্তন দেখতে চাইবে।‘
তবে এমন পরিবর্তনের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করেন মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক উপপরিচালক জোনাথন পানিকফ। তার মতে, ইরানে যদি সরকার পরিবর্তন ঘটে, তবে তার জায়গায় যে সরকার আসবে, সেটি হয়তো আরো বেশি কঠোর হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের অনেকে বহুদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছে—ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে নতুন সূচনা হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, পরিস্থিতি আরো খারাপও হতে পারে।‘
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাচি হানেগবি দেশটির একটি টিভি চ্যানেলে বলেন, ‘একটি পরমাণু কর্মসূচিকে সামরিক পন্থায় পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তবে সামরিক অভিযান এমন এক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির পথ খুলে যাবে।‘
হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের পাশে থেকেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতেও সহযোগিতা করেছে। তবে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে কোনো অবস্থান নেয়নি। হোয়াইট হাউজ ও জাতিসংঘে ইরানি মিশন এ নিয়ে কোনো মন্তব্য দেয়নি।