ব্যাংকিং অন ক্লাইমেট ক্যাওস

জলবায়ু বিপর্যয় ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে রেকর্ড বিনিয়োগ

তথাকথিত ‘ডার্টি ডজন’ বা শীর্ষ ১২টি ব্যাংকই এ সামগ্রিক অর্থায়নের ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী। আর ভৌগোলিকভাবে এ তহবিলের প্রায় সবটুকুই আসছে বিশ্বের মাত্র ৬টি প্রধান অঞ্চল— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, চীন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে

বিশ্বের বৃহত্তম ৬৫টি ব্যাংক গত বছর জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে নতুন করে ৯০৬ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘ব্যাংকিং অন ক্লাইমেট ক্যাওস’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন কোনো পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নয়, বিদ্যমান জীবাশ্ম জ্বালানি সাইটগুলোর সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলো গত বছর ৫০৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে বিশ্বজুড়ে যখন কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার সীমিত করার জোর তাগিদ চলছে, সেসময় এ বিপুল পরিমাণ অর্থায়নকে অকল্পনীয় বৃদ্ধি বলে আখ্যায়িত করেছেন পরিবেশ গবেষক ও বিশ্লেষকরা। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়নের যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি দশকেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির নিরাপদ সীমা চিরতরে পার হয়ে যাবে এবং বিশ্ব আরও ভয়াবহ দাবদাহ, বন্যা ও খরার মুখোমুখি হবে।

এ বিশাল পরিমাণ পুঁজি কিন্তু পুরো বিশ্ব থেকে সমহারে আসছে না। পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোর ভাষায়, তথাকথিত ‘ডার্টি ডজন’ বা শীর্ষ ১২টি ব্যাংকই এ সামগ্রিক অর্থায়নের ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী। আর ভৌগোলিকভাবে এ তহবিলের প্রায় সবটুকুই আসছে বিশ্বের মাত্র ৬টি প্রধান অঞ্চল— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, চীন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। বিনিয়োগের দিক থেকে বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের ব্যাংকগুলো শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে মার্কিন ব্যাংক জেপিমরগান চেজ, যারা গত বছর এ খাতে একাই ৫৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এরপরই রয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা, জাপানের এমইউএফজি ও মিজুহো ফাইন্যান্সিয়াল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিটিগ্রুপ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বার্কলেস রয়েছে অষ্টম স্থানে।

ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নেয়া ঋণের সিংহভাগ অর্থ গেছে তিনটি প্রধান মার্কিন তেল ও গ্যাস অপারেটর কোম্পানি— ভেঞ্চার গ্লোবাল, এনব্রিজ ও এনার্জি ট্রান্সফারের কাছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, যার ফলে এ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো আকাশচুম্বী মুনাফা অর্জন করছে। তবে সামগ্রিক নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে। শীর্ষ ৬৫টি ব্যাংকের মধ্যে ২৬টি ব্যাংক গত বছর জীবাশ্ম জ্বালানিতে তাদের অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে, যার মধ্যে নেতৃত্ব দিয়েছে ইউরোপের তিন শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক— বিএনপি পারিবাস, ইউবিএস এবং লা কাইসা।

কয়েক বছর আগেও বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্যাংক কার্বন নিঃসরণ কমানো ও কয়লার মতো জ্বালানিতে ঋণ দেয়া বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো তাদের সে পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি থেকে নীরবে কিংবা প্রকাশ্যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ওডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরুত্থান। জলবায়ু সংকটকে সরাসরি ভুয়া বলে আখ্যা দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনের পক্ষে ট্রাম্পের অবস্থান। এ রাজনৈতিক চাপের মুখে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে জলবায়ু সুরক্ষার ওপরে স্থান দিয়েছে, যার ফলে জাতিসংঘের ‘নেট-জিরো ব্যাংকিং অ্যালায়েন্স’টি গত বছর বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য নিজেদের কার্যক্রমের সপক্ষে যুক্তি দেয়া হয়েছে। জেপিমরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা এবং সিটিগ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট ও জটিল পরিস্থিতি বিবেচনা করে একাধারে ঐতিহ্যবাহী এবং নবায়নযোগ্য উভয় খাতেই ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, যাতে জ্বালানির বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী মূল্য বজায় থাকে।

আরও