আমরা কখনো বন্ধু ছিলাম না

নানজিং গণহত্যা ও চীন-জাপানের অমীমাংসিত সম্পর্ক

নানজিং দখলের পরের ছয় সপ্তাহ শহরটিতে গণহত্যা চালায় জাপানি সেনারা। সেসময় তাদের হাতে প্রাণ হারায় তিন লাখের বেশি মানুষ, ধর্ষণের শিকার হয় প্রায় ২০ হাজার নারী। তরুণীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য নানকিং থেকে বিভিন্ন জাপানী ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছিল। শিশুরাও জাপানী বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে যা নানজিং ম্যাসাকার নামেও পরিচিত।

বেশ কয়েকবছর ধরেই চীনে বাস করছেন জাপানি ভ্লগার হায়াতো কাতো। তার ১৯ লাখ অনুরাগী মূলত চীন ঘুরে দেখার মজার ভিডিওর জন্যই তাকে চেনেন। কিন্তু ২৬ জুলাই, তার মুখে শোনা গেল অন্যরকম এক গল্প—একটি সিনেমা দেখার পর অনুরাগীদের নিজের অনুভূতি বর্ণনা করছিলেন কাতো। তার দেখা সিনেমাটি ছিল নানজিং গণহত্যা সর্ম্পকিত।

সিনেমাটির নাম ‘ডেড টু রাইটস’ বা ‘নানজিং ফটো স্টুডিও’। গল্পটি ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এ সময়টাতে চীনের সাংহাই দখলের পর নানজিং শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল জাপানের সেনাবাহিনী। জীবন বাঁচাতে একদল সাধারণ মানুষ একটি ফটো স্টুডিওতে আশ্রয় নেয়। নানজিং দখলের পরের ছয় সপ্তাহ ধরে শহরটিতে গণহত্যা চালায় জাপানি সেনারা। সে সময় তাদের হাতে প্রাণ হারায় তিন লাখের বেশি মানুষ, ধর্ষণের শিকার হয় প্রায় ২০ হাজার নারী। তরুণীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য নানকিং থেকে বিভিন্ন জাপানি ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়েছিল। শিশুরাও জাপানি বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে যা নানজিং ম্যাসাকার নামেও পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাপানি দখলদারিত্বের বিভীষিকা তুলে ধরতে এ সিনেমাটি নির্মাণ করেছে চীন।

কাতো স্বীকার করেন, জাপানে এসব বিষয় খুব কমই আলোচনায় আসে, যুদ্ধবিরোধী চীনা সিনেমাও দেশটিতে প্রদর্শিত হয় না। জাপান নিজের যুদ্ধকালীন ইতিহাসে মূলত পারমাণবিক বোমা হামলা ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যেখানে চীনের দৃষ্টিতে জাপানি আগ্রাসনই প্রধান স্মৃতি। তবু নিজের দেশের মানুষদের উদ্দেশে চীনা ভাষায় ভিডিও বার্তা দেন কাতো। বলেন,—‘জাপানের ইন্টারনেটে অনেকেই নানজিং গণহত্যা অস্বীকার করেন, এমনকি রাজনীতিবিদরাও। যদি আমরা অস্বীকার করি, এটা আবারো ঘটতে পারে।’ তার সেই ভিডিও দুই সপ্তাহে ছয় লাখ ৭০ হাজারের বেশি লাইক পেয়েছে। সিনেমার একটি সংলাপ বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়েছে চীনা সামাজিক মাধ্যমে—‘আমরা বন্ধু নই, কখনো ছিলাম না।’ কথাটা যেন কেবল সিনেমার নয়, বরং বহু চীনা নাগরিকের মনের প্রতিধ্বনি।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গি-উক শিনের ভাষায়, সামরিক যুদ্ধ শেষ হলেও ইতিহাস যুদ্ধ এখনো চলছে। দুই দেশের স্মৃতিতে সেই সময়ের ব্যাখ্যা একেবারে আলাদা, যা সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ায়। চীন ১৯৩১ সালে মানচুরিয়ায় জাপানের প্রথম অনুপ্রবেশ থেকেই যুদ্ধের সূচনা গণনা করে, ফলে তাদের মতে এই যুদ্ধ ১৪ বছরের। চীনের জাতীয়তাবাদ জোরদার করতে এই সময়ের স্মৃতি ব্যবহার করছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

অনেকেই মনে করেন, জাপান কখনোই অতীতের নৃশংসতার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়নি—না কমফোর্ট উইমেন ইস্যুতে, না যুদ্ধকালীন অন্য অপরাধের জন্য। জীবিত ভুক্তভোগীরা আজও ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় আছেন।

তবে জাপান দাবি করছে, তারা একাধিকবার ক্ষমা চেয়েছে, কিন্তু চীন তা যথেষ্ট মনে করে না। চীনে প্রায়ই দেখানো হয় পশ্চিম জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাওয়ার ছবি, যেন বোঝানো হয়—ক্ষমার জন্য প্রয়োজন প্রতীকী সাহসও।

বিশ্লেষক ইয়িনান হের মতে, ১৯৭০-এর দশকে দুই দেশের সম্পর্ক যখন উষ্ণ ছিল, তখনই সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় ইতিহাসের ছায়া আবারো বর্তমানের কূটনীতিকে গ্রাস করছে।

আরও